বিশ্ব কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে

৩৪

দেশীবার্তা অনলাইন

বিশ্ব কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে
২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালকের কার্যালয়ের এক পর্যালোচনায় বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে ইরানে সবচেয়ে বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মজুত আছে

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের (আইসিজি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ৬৫টি সংঘাত চলমান রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একসঙ্গে এত বেশি সংঘাতের নজির আর দেখা যায়নি। ক্রমবর্ধমান এই অস্থিরতার মধ্যে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে—বিশ্ব কি আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে?

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রধান কূটনৈতিক ভাষ্যকার গিডিয়ন র‍্যাকম্যান মনে করেন, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা মূলত কোনো দেশের পরিকল্পিত যুদ্ধ শুরুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং পরাশক্তিগুলোর ভুল হিসাব, অসতর্ক সিদ্ধান্ত কিংবা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বড় ধরনের ভুল পদক্ষেপ থেকেই ভয়াবহ বৈশ্বিক সংঘাতের সূত্রপাত হতে পারে।

এই ঝুঁকির বাস্তবতা তুলে ধরতে ২০২২ সালের মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের প্রসঙ্গ টেনেছেন র‍্যাকম্যান। ওই সম্মেলন শেষ হওয়ার মাত্র চার দিন পরই ইউক্রেনে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। সম্মেলন চলাকালে একটি নৈশভোজে উপস্থিত ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার তৎকালীন প্রধান অ্যান্ড্রু শিয়ারার।

ইউক্রেনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার সময় সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনকে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমাদের এমন একটি পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে হচ্ছে, এটি বিশ্বাস করাই কঠিন।’

সে সময় অনেকের ধারণা ছিল, পুতিনের হুমকি কেবল কথার কথা, বাস্তবে তিনি ইউক্রেনে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালাবেন না। কিন্তু সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়, শুরু হয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এ ঘটনা মনে করিয়ে দেয় রুশ বিপ্লবী লিওন ট্রটস্কির নামে বহুল প্রচলিত একটি উক্তি—‘আপনি যুদ্ধ চান না, তাতে কী? যুদ্ধ কিন্তু আপনাকে চাইতে পারে।’ অর্থাৎ, কেউ যুদ্ধ এড়িয়ে চলতে চাইলেও বৈশ্বিক পরিস্থিতির টানাপোড়েনে একসময় সেই সংঘাতের অংশ হয়ে পড়তে পারেন।

বিশ্বনেতাদের বক্তব্যে বারবার ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বনেতাদের বক্তব্যেও বারবার উঠে আসছে ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের’ আশঙ্কা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতে, ইউক্রেনকে পশ্চিমা দেশগুলোর অব্যাহত সামরিক সহায়তা বিশ্বকে একটি বৃহত্তর যুদ্ধের ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিতে পারে।

অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মনে করেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সামরিক আগ্রাসন প্রতিরোধ করা না গেলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘পুরো বিশ্বকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা পুতিনকে থামাতে চাই, নাকি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা দেখতে চাই।’

ইউরোপের নেতারাও রাশিয়ার সামরিক হুমকিকে হালকাভাবে নিচ্ছেন না। ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে ইউরোপীয় দেশগুলোর নাগরিকদের সতর্ক করে বলেছেন, অতীতের প্রজন্ম যে ভয়াবহ যুদ্ধের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে, সেই মাত্রার সংঘাত মোকাবিলার প্রস্তুতি সবার রাখা প্রয়োজন।

ইউরোপের বাইরেও পরাশক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং প্রায়ই ‘থুসিডিডিস ট্র্যাপ’ তত্ত্বের প্রসঙ্গ তুলে ধরছেন। এই তত্ত্বে বলা হয়েছে, একটি প্রতিষ্ঠিত পরাশক্তির অবস্থানকে দ্রুত উত্থানশীল কোনো শক্তি চ্যালেঞ্জ করলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত কিংবা যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

এদিকে সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে ব্যাপকভাবে কাজ করছে চীন। দেশটি ইতিমধ্যে জাহাজের সংখ্যার হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে বিশ্বের বৃহত্তম নৌবাহিনীর অধিকারী হয়েছে। একই সঙ্গে প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তাইওয়ানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিষয়টিও নীতিগতভাবে উন্মুক্ত রেখেছে বেইজিং।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তাঁর দায়িত্ব পালনকালে অন্তত চারবার প্রকাশ্যে বলেছেন, চীন তাইওয়ানে হামলা চালালে দ্বীপটির প্রতিরক্ষায় প্রয়োজনে মার্কিন সেনাবাহিনী সরাসরি অংশ নেবে। ফলে তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের আশঙ্কাও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিশ্বনেতাদের বক্তব্যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা বারবার উঠে এলেও প্রকৃত অর্থে বিশ্বযুদ্ধ বলতে কী বোঝায়, তা নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম। সাধারণভাবে বিশ্বযুদ্ধের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রথমত, বিশ্বের প্রধান সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিগুলোকে সরাসরি একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিতে হবে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতিই দেখা গিয়েছিল।

দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের বিস্তৃতি হতে হবে একাধিক মহাদেশজুড়ে। এখন পর্যন্ত চলমান সংঘাতগুলো বিশ্বযুদ্ধের এই দুটি বৈশিষ্ট্য পূরণ করেনি। তবে ইউক্রেনের পশ্চিমা মিত্রদের লক্ষ্য করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধ, অগ্নিসংযোগ ও গুপ্তহত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এসব তৎপরতা থেকে ভুল বোঝাবুঝি কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনার মাধ্যমে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের ভাষায়, ‘আমরা যুদ্ধের মধ্যে নেই, আবার প্রকৃত শান্তির মধ্যেও নেই।’

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান এসব সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। যুক্তরাজ্য সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে প্রায় ১৫ লাখ রুশ সেনা নিহত বা আহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইউক্রেনীয় পক্ষেও সামরিক হতাহতের সংখ্যা কয়েক লাখে পৌঁছেছে।

এদিকে গাজা যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। এর বাইরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও কূটনৈতিক আলোচনায় তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পাওয়া সুদানের সংঘাতও ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি করেছে। এই সংঘাতের কারণে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছেন।

উদ্বেগের আরেকটি বড় কারণ হলো, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাতগুলো ক্রমেই একে অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে উঠছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে উত্তর কোরীয় সেনাদের সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে অংশগ্রহণ এই পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বিষয়টিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ‘বিশ্বযুদ্ধের প্রথম পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে হামলার ক্ষেত্রে ইরানকে রাশিয়া গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছে বলে ব্যাপক ধারণা রয়েছে। এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইউক্রেন উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ড্রোন শনাক্ত ও ভূপাতিত করার ক্ষেত্রে অর্জিত বাস্তব অভিজ্ঞতা বিনিময়ের প্রস্তাব দিয়েছে।

রাশিয়া, চীন, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক, সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতাও পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এই চার দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে অনেক বিশ্লেষক ‘প্রতিপক্ষের অক্ষ’ হিসেবে বর্ণনা করছেন।

২০২৪ সালে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, যার আওতায় কোনো পক্ষ সশস্ত্র হামলার শিকার হলে অন্য পক্ষ সামরিক সহায়তা দেওয়ার অঙ্গীকার করে। অন্যদিকে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর কিছুদিন আগে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং দুই দেশের সম্পর্ককে ‘সীমাহীন অংশীদারত্ব’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। এসব সমঝোতা ও সামরিক সহযোগিতা আঞ্চলিক সংঘাতকে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলছে।

পশ্চিমা দেশগুলোর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাশিয়ার সামরিক উৎপাদন অব্যাহত রাখতে চীনের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। যদিও রাশিয়া, চীন, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার নিজস্ব স্বার্থ ও কৌশলগত লক্ষ্য এক নয়, তবুও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি অসন্তোষের জায়গায় দেশগুলোর মধ্যে মিল রয়েছে।

এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে। তাঁর আশঙ্কা, ভবিষ্যতে চীন ও রাশিয়া এশিয়া ও ইউরোপে একই সময়ে সমন্বিত সামরিক অভিযান চালাতে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে পশ্চিমা দেশগুলোকে একাধিক অঞ্চলে একসঙ্গে সামরিক সংকট মোকাবিলা করতে হতে পারে, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।

পেশিশক্তির রাজনীতিতে বদলে যাচ্ছে বিশ্বব্যবস্থা

গিডিয়ন র‍্যাকম্যানের বিশ্লেষণে, বিশ্বজুড়ে সংঘাত ও উত্তেজনা বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন। ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীরের পতনের সময় জি-৭ জোটভুক্ত দেশগুলোর হাতে ছিল বিশ্বের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। একইভাবে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয়েরও উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়ন্ত্রণ করত এই দেশগুলো।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। ২০২২ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে জি-৭ দেশগুলোর সম্মিলিত অংশ কমে দাঁড়ায় প্রায় ৪৩ শতাংশে। অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী সামরিক ব্যয়ে তাদের অংশ নেমে আসে প্রায় অর্ধেকে। পশ্চিমা দেশগুলোর এই আপেক্ষিক প্রভাব হ্রাস পাওয়াকে র‍্যাকম্যান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে শক্তি প্রদর্শনের প্রবণতার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, এতে পশ্চিমা নেতৃত্বের বিরোধী দেশগুলো আরও সাহসী হয়ে উঠেছে।

এর পাশাপাশি আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে জনমত শক্তিশালী হয়েছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জো বাইডেন—তিনজনই দায়িত্ব পালনকালে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

র‍্যাকম্যানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিদেশের সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে ওয়াশিংটনের ক্রমবর্ধমান অনীহা রাশিয়া ও চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোকে আরও বেশি ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কূটনৈতিক সমঝোতার পাশাপাশি সামরিক শক্তি প্রদর্শনের প্রবণতাও বাড়ছে।

এই বৈশ্বিক অস্থিরতার পেছনে জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের উত্থান এবং সামরিক শক্তিনির্ভর রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মতো নেতাদের রাজনৈতিক অবস্থানে জাতীয় স্বার্থ ও ক্ষমতা প্রদর্শনের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। তাঁদের রাজনীতিতে ‘শক্তিই ন্যায়’—এমন ধারণার প্রতিফলন দেখা যায়।

মার্কিন রাজনীতিক স্টিফেন মিলার এ অবস্থান আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার নিয়ে আপনি যত খুশি আলোচনা করতে পারেন। কিন্তু বাস্তব পৃথিবী পরিচালিত হয় শক্তি, বলপ্রয়োগ ও ক্ষমতার নিয়মে।’

এ ধরনের শক্তিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অন্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ড দখল না করার আন্তর্জাতিক নীতিও নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান। তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করায় ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হয়।

সম্ভাব্য সামরিক দখলের আশঙ্কা মোকাবিলায় ডেনিশ কর্তৃপক্ষ গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরগুলোর রানওয়েতে মাইন স্থাপনের প্রস্তুতি বা ব্যবস্থা নিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্যে পরিণত করার বিষয়ে ট্রাম্পের বারবার দেওয়া বক্তব্যও দুই দেশের সম্পর্কে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর প্রভাবে কানাডা নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা সুরক্ষায় প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা নতুন করে পর্যালোচনা করতে বাধ্য হয়েছে।

পরাশক্তিদের প্রভাববলয় ভাগাভাগির ধারণা নিয়ে সংশয়

কিছু পরাশক্তির ধারণা, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের প্রভাবক্ষেত্র নির্ধারণ করে নিলে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা কমবে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা সহজ হবে। তবে গিডিয়ন র‍্যাকম্যান এই ধারণাকে বাস্তবতাবিবর্জিত বলে মনে করেন। তাঁর মতে, এ ধরনের সমঝোতা ছোট-বড় বিভিন্ন রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারকে উপেক্ষা করে।

ইউক্রেন, তাইওয়ান কিংবা কানাডার মতো দেশ ও অঞ্চলের নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে। পরাশক্তিগুলোর মধ্যে প্রভাববলয় ভাগাভাগির চুক্তি হলে এসব রাষ্ট্রের স্বার্থ ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তাইওয়ানকে ঘিরে এই জটিলতা আরও স্পষ্ট। বিশ্বের উন্নত প্রযুক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অত্যাধুনিক সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের বড় অংশই দ্বীপটিতে তৈরি হয়। ফলে তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুধু ভূরাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উদ্বেগেরও বিষয়।

একইভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও ছাড় দেওয়ার সুযোগ সীমিত। পোল্যান্ড কিংবা রোমানিয়ার মতো সদস্যরাষ্ট্রকে আবার রাশিয়ার প্রভাববলয়ে চলে যেতে দেওয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে গ্রহণযোগ্য হবে না। ফলে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে প্রভাবক্ষেত্র ভাগাভাগির মাধ্যমে বিশ্বে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ধারণা বাস্তবায়নে বড় ধরনের বাধা রয়েছে।

স্নায়ুযুদ্ধের সময় পারমাণবিক যুদ্ধের ভয় সত্ত্বেও সামরিক প্রতিরোধের কৌশল (ডিটারেন্স) সফল হয়েছিল। ১৯৬২ সালের কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের মতো মুহূর্তেও ওয়াশিংটন ও মস্কো সরাসরি সংঘাতে জড়ায়নি। দুই পক্ষই জানত, পাল্টাপাল্টি লড়াইয়ের পরিণতি ধ্বংসাত্মক হবে। কিন্তু আজ সেই সামরিক প্রতিরোধের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প নিয়মিত ন্যাটো মিত্রদের সমালোচনা করছেন। ফলে বাল্টিক দেশ, পোল্যান্ড, জাপান কিংবা যুক্তরাজ্য আক্রান্ত হলে ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত পাশে দাঁড়াবে কি না, তা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলছে, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ও সামরিক জোটের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ভুল ধারণা অনেক সময় বিশ্বযুদ্ধের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনালগ্নে যুক্তরাজ্য বেলজিয়ামের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা রক্ষার অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু জার্মান নেতৃত্বের ধারণা ছিল, ১৮৩৯ সালের সেই আন্তর্জাতিক চুক্তি কেবলই ‘এক টুকরা কাগজ’। তাদের বিশ্বাস ছিল, বেলজিয়ামে আক্রমণ করলেও যুক্তরাজ্য সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে না। শেষ পর্যন্ত সেই হিসাব ভুল প্রমাণিত হয় এবং জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেয় ব্রিটেন।

একই ধরনের কৌশলগত ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটে ১৯৩৯ সালেও। জার্মান নেতা অ্যাডলফ হিটলার ধারণা করেছিলেন, পোল্যান্ডের ওপর আক্রমণ চালালেও যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স আগের সংকটগুলোর মতো এবারও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকবে। কিন্তু তাঁর সেই অনুমান সত্য হয়নি। পোল্যান্ডে জার্মান আগ্রাসনের পর ১৯৩৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এর মধ্য দিয়েই ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা ঘটে।

এই ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো দেখায়, প্রতিপক্ষের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতিকে গুরুত্ব না দেওয়া কিংবা সামরিক জোটের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ভুল ধারণা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক কিছু আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ন্যাটোর ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে সেটিকে সবার ওপর হামলা হিসেবে দেখা হয়। তবে কোন দেশ কী ধরনের সহায়তা দেবে, তা তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্তের বিষয়। সেখানে সরাসরি সেনা পাঠানোর আইনি বাধ্যবাধকতা নেই।

একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট দ্বীপটির সুরক্ষায় অস্ত্র বিক্রির নিশ্চয়তা দিলেও সেনা পাঠানোর বাধ্যবাধকতা দেয় না। এই অস্পষ্টতা বড় বিপদের কারণ। বেইজিং কিংবা মস্কো যদি ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতিকে শুধু কাগুজে অঙ্গীকার মনে করে, তবে সেই ভুল হিসাব হতে পারে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্ফুলিঙ্গ। কোনো পরাশক্তি হয়তো বিশ্বযুদ্ধ চায় না। কিন্তু প্রতিপক্ষের মনোভাব নিয়ে একটি ভুল ধারণা এমন সংঘাত শুরু করতে পারে, যা কারও নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।

(সূত্র: ফিন্যান্সিয়াল টাইমস)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *