দেশীবার্তা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত প্রশমনে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সম্পর্ক। ইসরাইলের নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করছে, এই সমঝোতা দেশটির দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা স্বার্থ এবং কৌশলগত সামরিক উদ্দেশ্য পূরণে যথেষ্ট সহায়ক নয়। এর ফলে চুক্তিকে ঘিরে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার প্রভাব কমিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল জোটের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই একই সুরে কথা বলে আসছিলেন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার বদলাতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন সংঘাত নিরসন ও কূটনৈতিক সমাধানের দিকে বেশি মনোযোগী, যা ইসরাইলের কড়া অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে দুই নেতার রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কৌশলের মধ্যে দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ইসরাইলের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, যিনি পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি, জানান যে চুক্তিটি দেশটির নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য অনুকূল নয় বলে অনেকেই মনে করছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের শীর্ষ পর্যায়ে এই সমঝোতা নিয়ে সন্তুষ্টি নেই।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো—৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময়কে কাজে লাগিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ভিত্তি তৈরি করা। এ সময়ে অনুষ্ঠিত আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমসহ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগগুলো গুরুত্ব পাবে বলে ওয়াশিংটনের দাবি। তবে ইসরাইলি মহলে আশঙ্কা রয়েছে যে আলোচনা দীর্ঘায়িত হলে তাদের সামরিক বিকল্পগুলো ক্রমেই সীমিত হয়ে যেতে পারে।
লেবানন প্রসঙ্গেও দুই পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে সীমান্তবর্তী উত্তেজনা কমিয়ে আনার পক্ষে, সেখানে ইসরাইল ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক চাপ বজায় রাখতে আগ্রহী।
প্রতিবেদনটি আরও উল্লেখ করেছে, চলতি মাসের শুরুতে এক ফোনালাপে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে বৈরুতে নতুন হামলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। সে সময় অভিযান স্থগিত রাখা হলেও কয়েক দিনের মধ্যে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে আবার হামলা চালায় ইসরাইল। পরবর্তীতে ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ ঘটনায় ট্রাম্প উভয় পক্ষের পদক্ষেপের সমালোচনা করেন।
চুক্তি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগেও উত্তেজনা প্রশমনের কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। রোববার বৈরুতের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে বিমান হামলা চালায় ইসরাইল। একই সময়ে ট্রাম্প সীমান্তে ঘটে যাওয়া রকেট হামলাকে তুলনামূলকভাবে সামান্য ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে এর গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রস্তাবিত সমঝোতা চুক্তিতে আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের পরিকল্পনা রয়েছে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্ত থাকা পাকিস্তানের সূত্রগুলো জানিয়েছে, চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য হলো লেবাননসহ আঞ্চলিক সব সংঘাতপূর্ণ এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা।
তবে ইসরাইল স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা এই সমঝোতার সব দিক মেনে চলতে বাধ্য নয়। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ বলেছেন, লেবানন, সিরিয়া এবং গাজার কৌশলগত এলাকাগুলোতে ইসরাইলি বাহিনীর উপস্থিতি অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে দেন, লেবাননের পরিস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ইরান যদি ইসরাইলের বিরুদ্ধে কোনো হামলা চালায়, তাহলে তার কঠোর প্রতিক্রিয়া দেওয়া হবে।
চুক্তির ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো অনিশ্চিত এবং তা আগামী ৬০ দিনের আলোচনার ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং অঞ্চলজুড়ে মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থনের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো বর্তমান আলোচনার মূল এজেন্ডায় নেই।
দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই সমঝোতা নেতানিয়াহুর জন্য নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সামনে নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে তিনি এতদিন ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে নিজের অন্যতম শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই রাজনৈতিক সুবিধাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
তেল আবিবের নিকটবর্তী বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষক জনাথন রাইনহোল্ডের মতে, বর্তমান চুক্তিকে ইসরাইলি জনমতের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা নেতানিয়াহুর জন্য কঠিন হবে। তার ধারণা, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে সুবিধাজনক পরিস্থিতি হতে পারে—নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আলোচনা অচলাবস্থায় পৌঁছানো এবং পরবর্তীতে সংঘাতের নতুন অধ্যায় শুরু হওয়া।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, ইসরাইলি জনগণের মধ্যে ট্রাম্পের প্রতি আস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে মাত্র ৪১ শতাংশ ইহুদি ইসরাইলি বিশ্বাস করেন যে ট্রাম্প ইসরাইলের নিরাপত্তা স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেন। কয়েক মাস আগেও, মার্চে, এই হার ছিল ৬৪ শতাংশ। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে জনমনে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এদিকে ইসরাইলের জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেন কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইরান যদি ভবিষ্যতে তার পারমাণবিক কর্মসূচি বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন কার্যক্রম পুনরায় সক্রিয় করার চেষ্টা করে, তাহলে ইসরাইল প্রয়োজনে এককভাবেই প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা এবং তা ঘিরে উদ্ভূত কূটনৈতিক বাস্তবতা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে এটি ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্কের ভবিষ্যৎ এবং ইসরাইলের নিরাপত্তা কৌশল নিয়েও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স