ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের ১৩টি জেলায় শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে।

৪২

দেশীবার্তা অনলাইন।

বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যেও এইচএসসি পরীক্ষা গ্রহণ, পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্নপত্রে বিভিন্ন ত্রুটি এবং প্রশ্নের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের একাধিক জেলায় আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার দিনজুড়ে তারা বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সমাবেশ কর্মসূচি পালন করেন। সন্ধ্যার দিকে আন্দোলনকারীরা জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের সড়কে অবস্থান নিলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে তাঁদের সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। তবে কিছু সময়ের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা পুনরায় একত্রিত হয়ে একই এলাকায় সড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন।

রাত প্রায় ৯টা ৪৫ মিনিটে দিনের কর্মসূচি শেষ করে আন্দোলনকারীরা নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দেন। তাঁদের দাবি, বুধবারের নির্ধারিত এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত না করা হলে বিকেল ৩টায় সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকা থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশে ‘লংমার্চ’ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে করা বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগসহ তিন দফা দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন তারা। অন্যদিকে, শিক্ষামন্ত্রী তাঁর ওই মন্তব্যের জন্য মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেন।

মঙ্গলবার সকাল থেকেই ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের অন্তত ১৩টি জেলায় আন্দোলনে অংশ নেন শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ কর্মসূচির পাশাপাশি বরিশাল, টাঙ্গাইল ও রাজধানীতে মহাসড়ক অবরোধ করা হয়। অন্যদিকে চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা বোর্ডের কার্যালয় ঘেরাও করে নিজেদের দাবি তুলে ধরেন। রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকা, মিরপুরের ইসিবি চত্বর এবং উত্তরায় দিনভর সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ চলায় যানবাহন চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে আশপাশের সড়কগুলোতে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়ে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে যায়।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, প্রতিকূল আবহাওয়া ও ব্যাপক জলাবদ্ধতার মধ্যেও সোমবার এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় অনেক পরীক্ষার্থী নির্ধারিত কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি। এ কারণে তারা দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সব পরীক্ষা স্থগিত রাখার দাবি জানান। পাশাপাশি যারা ওই দিন পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি, তাদের জন্য পুনরায় পরীক্ষা আয়োজনেরও আহ্বান জানান।

শিক্ষার্থীদের আরও অভিযোগ, শিক্ষামন্ত্রী তাঁদের সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন এবং ‘ফার্মের মুরগি’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। এ বক্তব্যের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা না করলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁর পদত্যাগের দাবি জানান আন্দোলনকারীরা।

সংসদ ভবনের দিকে অগ্রসর, পুলিশের বাধা

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সারাদিন বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের পর সন্ধ্যায়, জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলাকালে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সংসদ ভবনের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এ সময় পুলিশ লাঠিচার্জ করে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এরপরও দাবি আদায় না হওয়ায় রাত ৮টার দিকে শিক্ষার্থীরা বুধবার অনুষ্ঠিতব্য সব শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেন। কিছুক্ষণ পর, রাত ৮টা ১০ মিনিটের দিকে, তাঁরা আবার সংসদ ভবনের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন।

এর আগে মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে রাজধানীর বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় অবরোধের মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু করেন। পরে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরে সমবেত হন। সেখান থেকে পুলিশ তাঁদের সরিয়ে দিলে আন্দোলনকারীরা বকশীবাজারে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের কার্যালয়ের সামনে গিয়ে অবস্থান নেন। সেখানে তারা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দেন এবং বোর্ডের কার্যক্রমের প্রতিবাদ জানান। একপর্যায়ে কিছু বিক্ষোভকারী ইট নিক্ষেপ করেন এবং শিক্ষা বোর্ডের প্রধান ফটকের সামনে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। পরে সেখান থেকে সরে এসে বিকেল পৌনে চারটার দিকে তারা পুনরায় সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন।

ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের ১৩টি জেলায় শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন

সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলাকালে জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে তাঁদের উত্থাপিত বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে সরে গিয়ে লেখাপড়ায় মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে থাকা দুটি ভুলের কারণে সব পরীক্ষার্থীকে ওই প্রশ্নের পূর্ণ নম্বর দেওয়ার ঘোষণা দেন। যেসব কেন্দ্রে প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে পরীক্ষা আয়োজন ব্যাহত হয়েছে, সেখানে প্রয়োজন হলে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

তবে মন্ত্রীর এ বক্তব্যে সন্তুষ্ট হননি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। বিকেল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে তাঁরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবি ঘোষণা করেন। এরপর সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় থেকে মিছিল নিয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে গিয়ে অবস্থান নেন। অধিবেশন চলাকালে সেখানে তাঁরা ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান দেন। একপর্যায়ে সংসদ ভবনে প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের ১৩টি জেলায় শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা করে পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে .

শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণার পরও আন্দোলন অব্যাহত রাখার কারণ জানতে চাইলে আন্দোলনকারী এক শিক্ষার্থী বলেন, মন্ত্রীর আশ্বাসের ওপর তাঁদের আস্থা নেই। তাঁর দাবি, অতীতেও শিক্ষামন্ত্রী একাধিক প্রতিশ্রুতি দিলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি। এ কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁরা তাঁকে দায়িত্ব পালনের জন্য উপযুক্ত মনে করছেন না এবং তাঁর পদত্যাগের দাবিতে অনড় রয়েছেন।

শিক্ষামন্ত্রীর দুঃখপ্রকাশ

শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে করা বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে দুঃখ প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। মঙ্গলবার রাতে জাতীয় সংসদে একটি বিলের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। বক্তব্যে তিনি বলেন, সোমবার অনুষ্ঠিত পদার্থবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা পরীক্ষার সময় অনেক এলাকায় বৃষ্টিপাতের কারণে পরীক্ষার্থীরা নানা ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। তাঁর কাছে এমন অভিযোগও এসেছে যে, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে অনেক শিক্ষার্থী যথাযথভাবে পরীক্ষা দিতে পারেননি।

শিক্ষামন্ত্রী জানান, বন্যা পরিস্থিতির কারণে এরই মধ্যে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন সব জেলার পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। এসব পরীক্ষা পরবর্তীতে আবার নেওয়ার প্রয়োজন হবে। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বোর্ডের স্থগিত পরীক্ষার নতুন সময়সূচির সঙ্গে সমন্বয় করে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

নিজের মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, তাঁর ব্যক্তিগত একটি বক্তব্য নিয়ে অনেকে আপত্তি জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, কাউকে উদ্দেশ্য করে বা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তাঁর কথায় কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে তিনি এ জন্য দুঃখ প্রকাশ করছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *