৭ নভেম্বরের চেতনাকে ধারণ করে জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করার আহ্বান

৩১

দেশীবার্তা অনলাইন

৭ নভেম্বরের চেতনাকে ধারণ করে জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করার আহ্বান
ছবি: বিএনপির ফেসবুক পেইজ থেকে নেওয়া
৭ নভেম্বরের চেতনাকে ধারণ করে জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করার আহ্বান
ছবি: বিএনপির ফেসবুক পেইজ থেকে নেওয়া

ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের চেতনাকে ধারণ করে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতে যেন কোনো শক্তি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকার কেড়ে নিতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

শনিবার (৭ নভেম্বর) ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে রাজধানীর বনানী আর্মি স্টেডিয়ামে আয়োজিত বিশেষ প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সশস্ত্র বাহিনীর তত্ত্বাবধানে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখা এবং দেশকে অন্য কোনো রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হতে না দেওয়াই ৭ নভেম্বরের চেতনা থেকে নেওয়া অন্যতম প্রধান শিক্ষা। দেশের আর্থসামাজিক, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের চেতনা ধারণ করা জরুরি।

অনুষ্ঠানে তরুণ প্রজন্মের ইতিহাসভিত্তিক প্রদর্শনীর প্রশংসা করে তিনি বলেন, ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ নতুন প্রজন্ম যেভাবে উপস্থাপন করেছে, তা প্রশংসার দাবি রাখে। এ জন্য অংশগ্রহণকারী তরুণ-তরুণীদের অভিনন্দন জানান তিনি। একই সঙ্গে সবাইকে নজরুল বর্ষের শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী।

তারেক রহমান বলেন, স্বাধীনতাপ্রিয়, দেশপ্রেমিক ও গণতন্ত্রকামী মানুষের কাছে ৭ নভেম্বর একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহি ও সাধারণ মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে চলমান ষড়যন্ত্র প্রতিহত করেছিল। সে কারণে দিনটি জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

১৯৭৫ সালের নভেম্বরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই সময় দেশের বিরুদ্ধে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ২ নভেম্বর দিবাগত রাতে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গৃহবন্দি করা হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের স্বার্থবিরোধী সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিপাহি-জনতা একত্র হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, ৭ নভেম্বরের পরও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নানা পরিবর্তন এসেছে। তাঁর অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে একটি রাজনৈতিক জোটের শাসনামলে দেশের গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত হয় এবং পিলখানায় বিডিআর হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা হয়। পরে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আবারও রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে। ওই আন্দোলনে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি।

১৯৭১ ও ২০২৪ সালের আন্দোলনের তুলনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম। অন্যদিকে, তাঁর বক্তব্যে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে দেশের স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকার রক্ষার আন্দোলন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তিনি বলেন, দুই সময়েই দেশের মানুষ নিজেদের অধিকার ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।

তারেক রহমানের মতে, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলের দিন। তাঁর বক্তব্য, এ দিনের চেতনা থেকে দেশ যতবার দূরে সরে গেছে, ততবারই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

জাতীয় পরিচয়ের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায় ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের সব নাগরিকের অভিন্ন পরিচয় বাংলাদেশি। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কিংবা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ—সবার নাগরিক পরিচয় এক। এই পরিচয়ই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ভিত্তি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের অস্তিত্ব যত দিন থাকবে, তত দিন ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব আলোচিত হবে। এ দিনের মূল নায়ক হিসেবে তিনি দেশপ্রেমিক সিপাহি ও সাধারণ মানুষের কথা উল্লেখ করেন।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদানের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। একইভাবে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরও দেশের সার্বভৌমত্বের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। এ সময় স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিনি।

ইতিহাসচর্চার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি জাতির ইতিহাস শুধু অতীতের ঘটনা স্মরণ করার বিষয় নয়; বরং জাতির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও ভবিষ্যৎ গঠনের অন্যতম ভিত্তি। এবারের প্রদর্শনীতে হাজারো কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণী বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায় তুলে ধরেছে। ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন নতুন প্রজন্ম জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, তরুণ সমাজের মধ্যে জাতীয়তাবোধ ও দেশপ্রেমের চর্চা না থাকলে একটি জাতির ঐক্য শক্তিশালী করা কঠিন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে তরুণদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের স্বার্থে এ দেশের তরুণ সমাজ বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ দায়িত্ব সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা অর্জনের গৌরব ধরে রাখার পাশাপাশি তা বাস্তব জীবনে অর্থবহ করে তোলা প্রত্যেক প্রজন্মের কর্তব্য। বিশেষ করে তরুণদের একটি নিরাপদ, সমৃদ্ধ, মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার কাজে এগিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে তরুণদের সম্ভাবনা বিকাশের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করাকে সরকারের দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সরকারের অঙ্গীকার তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে বর্তমান সরকার কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং গণতন্ত্রের ওপর আঘাত এলে জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সব বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এ সময় তিনি সবার আগে বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ; সবার আগে বাংলাদেশ।’

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের (বিএনসিসি) প্রায় ৩ হাজার ক্যাডেট এবং বাংলাদেশ স্কাউটসের ৫০০ সদস্য অংশ নেন। এ সময় সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর প্রধান, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও রাষ্ট্রদূতরা উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *