
সোমবার বিকেলে ফেসবুক পোস্টে এসব কথা বলেন হাসনাত।
ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, সংসদের প্রথম অধিবেশনে তিনি বলেছিলেন—পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করে কাজ চালানোর যে সংস্কৃতি, সেখান থেকেই দুর্নীতির জন্ম হয়। তবে পরে বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে তিনি উপলব্ধি করেন, এই ‘ম্যানেজ’ করার প্রবণতা আসলে একটি কাঠামোগত সমস্যার ফল।
তিনি উল্লেখ করেন, খুন ও ডাকাতির মতো গুরুতর মামলার তদন্তে একজন তদন্ত কর্মকর্তার জন্য বরাদ্দ থাকে মাত্র ৬ হাজার টাকা। অথচ এসব মামলার তদন্ত সম্পন্ন হতে কয়েক বছর লেগে যায় এবং এ সময়ের মধ্যে একাধিকবার তদন্ত কর্মকর্তাও পরিবর্তিত হন। সীমিত এই বাজেটে কয়েকবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতেই পুরো অর্থ শেষ হয়ে যায়।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে তিনি বলেন, মানি লন্ডারিংয়ের মতো জটিল ও সংবেদনশীল মামলার তদন্তে বরাদ্দ মাত্র ৩ হাজার টাকা। হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থ পাচারের মতো ঘটনায় চার্জশিট প্রস্তুত ও অপরাধ প্রমাণের কাজে এই অঙ্ক বাস্তবতার সঙ্গে একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি পুলিশ সদস্যদের কাছ থেকে জানা তথ্য তুলে ধরে বলেন, আদালতে যাতায়াত, সাক্ষ্য দেওয়া বা তদন্ত-সংক্রান্ত নানা খরচের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই কোনো সরকারি বরাদ্দ থাকে না। ফলে এসব ব্যয় তাদের নিজেদেরই বহন করতে হয়।
তার প্রশ্ন, একজন সরকারি কর্মচারী কেন রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের পকেট থেকে খরচ করবেন? বিশেষ করে কনস্টেবল, এএসআই বা এসআই পর্যায়ের সদস্যদের সীমিত বেতনে এটি কতটা সম্ভব?
তার মতে, এই বাস্তবতা অনেককে অনিচ্ছাকৃতভাবে বিকল্প উপায়ে অর্থ জোগাড়ে বাধ্য করে, যা ধীরে ধীরে দুর্নীতির একটি চক্র তৈরি করে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সংসদে তিনি পুলিশের জন্য প্রতিদিন ১৫–১৬ ঘণ্টা দায়িত্ব পালনের প্রেক্ষিতে ওভারটাইম সুবিধার কথা বলেছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন বলেও তিনি জানান, তবে এখন দরকার এর বাস্তবায়ন।
এছাড়া তিনি বলেন, পুলিশ যেন কাজ করতে গিয়ে কাউকে ‘ম্যানেজ’ করতে বা কারও কাছে হাত পাততে বাধ্য না হয়—এটি নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ জরুরি।
পুলিশ সদস্যদের কর্মপরিবেশ নিয়েও তিনি মন্তব্য করেন। অন্যান্য সরকারি চাকরিজীবীরা যেখানে সপ্তাহে দুই দিন ছুটি পান এবং নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা অনুসরণ করেন, সেখানে পুলিশের ক্ষেত্রে সাপ্তাহিক ছুটি প্রায় অনুপস্থিত।
জনবল সংকট ও জরুরি সেবার কারণে অতিরিক্ত সময় কাজ করা স্বাভাবিক হলেও তার যথাযথ প্রতিদান ও ওভারটাইম সুবিধা নিশ্চিত করা উচিত বলেও তিনি মত দেন। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে কর্মরতদের জন্য মানসম্মত, স্বাস্থ্যকর ও মর্যাদাপূর্ণ খাবারের ব্যবস্থাও তাদের অধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, এখনো অনেক মানুষ বিপদে পড়লে পুলিশের কাছে যেতে দ্বিধা করে। এই অবিশ্বাস দূর করা জরুরি এবং এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে মানুষ আস্থার সঙ্গে পুলিশের শরণাপন্ন হতে পারে।
তার মতে, একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো—পুলিশকে প্রয়োজনে ‘না’ বলতে শেখানো। আইনবহির্ভূত বা অন্যায় নির্দেশ এলে তা প্রত্যাখ্যান করার মানসিকতা ও সাহস থাকা দরকার। অনেক সময় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর চাপেও বেআইনি কাজ করানোর চেষ্টা হয়, এমনকি জনপ্রতিনিধিরাও কখনো কখনো অজান্তে সেই সংস্কৃতির অংশ হয়ে পড়েন—এ থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, পুলিশ সরকারের বৈধ ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অবশ্যই পালন করবে, সেটাই শৃঙ্খলার ভিত্তি। তবে বেআইনি নির্দেশ মানা বাধ্যতামূলক নয়। কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে, কিন্তু আইনের বাইরে গিয়ে কাউকে গ্রেপ্তার বা হয়রানি করা গ্রহণযোগ্য নয়।
এই অবস্থান কার্যকর করতে পুলিশ সদস্যদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর তিনি জোর দেন, যাতে বেআইনি নির্দেশ অমান্য করার কারণে তারা কোনো হয়রানির শিকার না হন। পাশাপাশি যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে পদায়ন ও পদোন্নতির ব্যবস্থার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
সবশেষে তিনি বলেন, পুলিশের পেশাগত স্বাধীনতা ও আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার। তবে একজন পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য শোনার পর তার প্রশ্ন থেকেই যায়—যে স্বাধীনতা ও সুরক্ষা পুলিশের জন্য নিশ্চিত করার কথা বলা হচ্ছে, পুলিশ বাহিনী নিজে তা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের জন্য কতটা প্রস্তুত?