
খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী বলেছেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে ভাস্কর্য ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনায় ভাঙচুরের ঘটনা কেবল ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড নয়; এর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে মুছে ফেলার প্রবণতাও প্রকাশ পায়। তিনি এ ধরনের পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও সংশ্লিষ্ট নানা প্রতিষ্ঠানে হামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মেহেরপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকাতেও ভাস্কর্য ও বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রফিকুন নবী বলেন, ‘এসব স্থাপনা আবার নির্মাণ করা সম্ভব, কিন্তু যেসব উদ্দেশ্যে এগুলো ভাঙচুর করা হয়েছে, সেটিই আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে।’
আজ সোমবার বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে আয়োজিত ‘বজলুর রহমান স্মৃতিপদক ২০২৫’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সাংবাদিকতায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এ বছর তিনজন সাংবাদিককে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। প্রিন্ট ও অনলাইন বিভাগে পুরস্কার পেয়েছেন আহমাদ ইশতিয়াক, আর ইলেকট্রনিক মিডিয়া বিভাগে সম্মাননা পেয়েছেন আহমেদ রেজা এবং পার্থ সনজয়।
স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক বজলুর রহমান–এর স্মরণে এ পদক চালু করা হয়। ২০০৮ সালে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী ও সাবেক কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী–র উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এই পুরস্কার প্রবর্তন করে। দীর্ঘদিন ধরে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সেরা প্রতিবেদনের জন্য এ সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে। পুরস্কারের সঙ্গে রয়েছে এক লাখ টাকা, একটি ক্রেস্ট ও সনদ।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে খ্যাতিমান শিল্পী রফিকুন নবী বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও ভাস্কর্যে হামলার ঘটনা মুক্তিযুদ্ধকে ‘ভুলিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা’ থেকেই ঘটানো হয়েছে বলে তাঁর ধারণা। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কখনো মুছে ফেলা সম্ভব নয়। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি, সেই স্মৃতি ধারণ করি। সেখান থেকে সরে যাওয়া সম্ভব নয়।’
স্বাধীনতার চেতনা ধারণ করে চলাকে দায়িত্ব হিসেবেও উল্লেখ করেন রফিকুন নবী। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ তাঁদের প্রজন্মের কাছে আজও জীবন্ত বাস্তবতা। একই সঙ্গে তরুণদের ভূমিকা তাঁকে আশাবাদী করে তোলে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভিডিও নির্মাণ, সাংবাদিকতা ও বিভিন্ন উদ্যোগের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, নতুন প্রজন্ম এখনো এসব বিষয় নিয়ে সক্রিয় ও সচেতন।
অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ও সদস্যসচিব মফিদুল হক। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাংবাদিকতার এই আয়োজন কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের সামনে দায়িত্ববোধের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে। তাঁর মতে, যাঁদের জন্ম মুক্তিযুদ্ধের বহু পরে, তাঁরাও অনুসন্ধান ও প্রতিবেদনের মাধ্যমে ইতিহাসের প্রতি নিজেদের দায়বদ্ধতা প্রকাশ করছেন।
মফিদুল হক আরও বলেন, ইতিহাসের পতাকা এখন তরুণদের হাতে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও জাদুঘরের আর্কাইভের সঙ্গে নতুন প্রজন্ম যত বেশি যুক্ত হবে, ততই মানবিক ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার বিকাশ ঘটবে। তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাস মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত; কারণ ১৯৭১ সালেই সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার ওপর প্রথম বড় আঘাত নেমে এসেছিল।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পুরস্কারের জুরিবোর্ডের সভাপতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়–এর গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক সভাপতি গোলাম রহমান। তিনি বলেন, অনেক তরুণ এখনো মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন ও বিভিন্ন গণ–আন্দোলনের ইতিহাসকে আলাদাভাবে অনুধাবন করতে পারে না, যা জাতির জন্য উদ্বেগের বিষয়। তাঁর মতে, নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
গোলাম রহমান আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালির শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি। এই ইতিহাসের সঙ্গে জাতির আত্মত্যাগ ও গৌরব অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই এ ইতিহাসকে বিকৃত বা খাটো করার কোনো সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরিতে সাংবাদিকদের নিষ্ঠা ও পরিশ্রমেরও প্রশংসা করেন গোলাম রহমান। তিনি বলেন, নানা সীমাবদ্ধতা ও চাপের মধ্যেও সাংবাদিকেরা জাতির স্মৃতি সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর–এর ট্রাস্টি সারওয়ার আলী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সাংবাদিকদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পাকিস্তান আমলে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তা সাহসিকতার সঙ্গে মানুষের সামনে তুলে ধরেছিলেন সে সময়ের সম্পাদক ও সাংবাদিকেরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্যের বিস্তার ঘটলেও নির্ভরযোগ্য তথ্যের জন্য মানুষ এখনো সংবাদমাধ্যমের ওপর আস্থা রাখে বলে মন্তব্য করেন সারওয়ার আলী। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার গুরুত্ব অপরিসীম। এ বছর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আর্কাইভ ও গবেষণা–উপকরণ সাংবাদিকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ায় তরুণ সাংবাদিকেরা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক মানসম্মত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির সুযোগ পেয়েছেন।
অনুষ্ঠানে প্রিন্ট মিডিয়া বিভাগে পদকপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণা ও শংসাবচন পাঠ করেন বজলুর রহমান স্মৃতিপদক জুরি বোর্ডের সদস্য মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু। আর ইলেকট্রনিক মিডিয়া বিভাগের বিজয়ীদের নাম ঘোষণা ও শংসাবচন পাঠ করেন জুরি বোর্ডের আরেক সদস্য সোহরাব হাসান।
এদিকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বিশেষ করে ১৯৭১ সালের গণহত্যা, তার পটভূমি, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং শান্তি ও সম্প্রীতির চর্চা নিয়ে গবেষণা এগিয়ে নিতে মীর আশরাফুল হক রিসার্চ ফান্ড থেকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর–কে এককালীন ১ কোটি টাকার অনুদান দেওয়া হয়েছে। স্থায়ী এ তহবিল থেকে অর্জিত অর্থ গণহত্যা, মুক্তিযুদ্ধ ও শান্তিশিক্ষা–সংক্রান্ত গবেষণা এবং গবেষণালব্ধ জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে ব্যয় করা হবে।
তহবিলটির পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব জেনোসাইড অ্যান্ড জাস্টিস। মীর আশরাফুল হক রিসার্চ ফান্ডের পক্ষে সাসক্যাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়–এর অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মবিনুল হক মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারওয়ার আলীর হাতে এক কোটি টাকার চেক তুলে দেন।