মিত্রদের সঙ্গে ট্রাম্পের বিবাদ দীর্ঘ হতে পারে।

৩৪
মিত্রদের সঙ্গে ট্রাম্পের বিবাদ দীর্ঘ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পফাইল ছবি: রয়টার্স

দীর্ঘ ১০ সপ্তাহের সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির পথে এগোলেও, ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য ও নীতিগত অবস্থান ওয়াশিংটনের মিত্র দেশগুলোর মধ্যে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অনেক দেশ আশঙ্কা করছে, ভবিষ্যতের কোনো বড় সংকটে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো আগের মতো দৃঢ়ভাবে তাদের পাশে দাঁড়াবে না।

এই অনিশ্চয়তার কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি দীর্ঘদিনের মিত্র দেশ এখন থেকেই বিকল্প কৌশল নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ধরনে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আসতে পারে। একই সময়ে চীন ও রাশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোও পরিস্থিতিকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগানোর সুযোগ খুঁজছে।

ইরানকে ঘিরে ট্রাম্পের নীতির কারণে বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা স্থায়ীভাবে বদলে যাবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে অনেক বিশ্লেষকের মতে, ক্ষমতায় আসার পর থেকে ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত ও অস্থির সিদ্ধান্তগুলো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে যুদ্ধকালীন সময়ে ন্যাটোকে নিয়ে তার অসন্তোষ এবং মিত্রদের ওপর চাপ প্রয়োগের কৌশল পশ্চিমা জোটগুলোর ঐক্যকে দুর্বল করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ওবামা প্রশাসনের সাবেক উপদেষ্টা ব্রেট ব্রুয়েনের ভাষ্য, ইরান প্রশ্নে ট্রাম্পের আগ্রাসী অবস্থান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তার মতে, এতে এখন যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা ও বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

ইউরোপের সঙ্গে বাড়ছে টানাপোড়েন

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানে হামলার পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোর সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে হামলাটি চালানো হলেও, ওই দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে বিশ্ববাজারে তীব্র জ্বালানি সংকট তৈরি হয়। এতে সরাসরি যুদ্ধে জড়িত না থাকলেও ইউরোপের দেশগুলো বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপে পড়ে।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন ট্রাম্প জার্মানি থেকে ৫ হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। ধারণা করা হয়, জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের একটি মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়েই তিনি এই পদক্ষেপ নেন। মের্ৎস প্রকাশ্যে বলেছিলেন, “ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র চাপে পড়ে গেছে।” এর কিছুদিন পর পেন্টাগন জার্মানিতে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনাও বাতিল করে। পাশাপাশি ইতালি ও স্পেন থেকেও সেনা সংখ্যা কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন।

মিত্রদের সঙ্গে বাড়ছে মতবিরোধ

মিত্র দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা দিচ্ছে না—এমন অভিযোগ তুলেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এ প্রসঙ্গে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি জানান, ন্যাটো ও অন্যান্য অংশীদারদের ভূমিকা নিয়ে ট্রাম্পের অসন্তোষ নতুন নয়। তাঁর দাবি, ইরান যুদ্ধ চলাকালে ইউরোপের কয়েকটি দেশ নিজেদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।

ট্রাম্প এর আগেও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে প্রকাশ্যে কটাক্ষ করেছেন। পাশাপাশি ব্রিটিশ পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়েছেন। এদিকে পেন্টাগনের ভেতরে স্পেনের ন্যাটো সদস্যপদ সাময়িক স্থগিত করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে খবর বেরিয়েছে। একই সঙ্গে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর যুক্তরাজ্যের সার্বভৌম দাবির স্বীকৃতি পুনর্বিবেচনার কথাও উঠে এসেছে।

এই পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে তারা প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো এবং যৌথভাবে অস্ত্র উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে। জাপানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাকেশি ইওয়ায়া মন্তব্য করেছেন, “সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ও সম্মান ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপর পড়তে পারে।”

অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় রাশিয়া অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে। একই সময়ে চীন নিজেকে ট্রাম্প প্রশাসনের তুলনায় আরও স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য বৈশ্বিক অংশীদার হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

আগামী সপ্তাহে ট্রাম্পের চীন সফরের কথা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মিত্রদের সঙ্গে তার ক্রমবর্ধমান দূরত্ব আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রভাব ও নেতৃত্বকে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *