দেশী বার্তা অনলাইন।

ব্রিটেনের উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য বাধ্যতামূলক টোল চালু করা হলে তা গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ব্রিটিশ সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর মতে, মালাক্কা প্রণালি ও ইংলিশ চ্যানেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথে যেভাবে নির্দিষ্ট নৌ-সেবার বিনিময়ে ফি আদায় করা হয়, তেমনি একটি ব্যবস্থা হরমুজ প্রণালির ক্ষেত্রেও বিবেচনায় আনা যেতে পারে।
হরমুজ প্রণালি সব দেশের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং সেখানে নিরাপদ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করা হবে—এ মর্মে প্রকাশ্যে অবস্থান জানাতে ইরানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, তেহরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে মতপার্থক্যের কারণে এ বিষয়ে সমঝোতা বাস্তবায়ন জটিল হয়ে উঠেছে। তবে ইরান এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, হরমুজ প্রণালিসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সব নীতিগত বিষয়ে দেশটির নেতৃত্ব একই অবস্থানে রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, যুদ্ধবিরতির অন্তর্বর্তী চুক্তির কার্যকারিতা শেষ হয়েছে। তবে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নিজের বিরুদ্ধে ইরানের পক্ষ থেকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ তুলে তিনি কঠোর সতর্কবার্তা দেন।
অন্যদিকে, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর দায়িত্ব গ্রহণকারী তার ছেলে মোজতবা খামেনি এক বিবৃতিতে বলেন, তার বাবার হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া হবে এবং এটিই ইরানি জনগণের প্রত্যাশা।
হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমান মালাক্কা প্রণালির সহযোগিতামূলক কাঠামো অনুসরণ করে একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছে। ব্রিটিশ আইন বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় প্রণীত ওই প্রস্তাবের বিস্তারিত তুলে ধরতে ওমান তাদের বিশেষজ্ঞদের তেহরানে পাঠানোর আগ্রহও প্রকাশ করেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও নৌ-চলাচল নিয়ে আলোচনার জন্য শিগগিরই ওমান সফর করবেন। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও আশা প্রকাশ করেছেন, এ বিষয়ে ইরান ও ওমান দ্রুত একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে।
তবে কূটনৈতিক যোগাযোগের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে তেহরান। ইরানের দাবি, দেশটির তেল মার্কিন ডলারে বিক্রির ক্ষেত্রে আগে দেওয়া যে ছাড় ছিল, ওয়াশিংটন তা প্রত্যাহার করেছে।
হরমুজ প্রণালির অধিকাংশ নৌপথ ওমানের নিয়ন্ত্রণে থাকায় দেশটি বাধ্যতামূলক ট্রানজিট টোল আরোপের বিরোধিতা করছে। একই সঙ্গে কাতারও সতর্ক করে বলেছে, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন উপেক্ষা করে যদি ইরানকে প্রণালির ওপর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব দেওয়া হয়, তাহলে তা গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর ভেতরেও এ বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে। একটি অংশ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন মেনে চলার পক্ষে থাকলেও আরেকটি অংশ সে অবস্থান সমর্থন করে না। ফলে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরানের অভ্যন্তরীণ অবস্থান পুরোপুরি অভিন্ন নয়।
লন্ডনে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) কাউন্সিল বৈঠকে ওমানের প্রতিনিধি খামিস বিন মোহাম্মদ আল শামাখি বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করা বাধ্যবাধকতা এবং সেখানে বাধ্যতামূলক ট্রানজিট ফি আরোপের কোনো আইনি সুযোগ নেই। তবে নৌ-নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং দুর্ঘটনা মোকাবিলার মতো সেবার জন্য স্বেচ্ছাভিত্তিক সহায়তা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
এদিকে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ ও ইউরোপের কিছু রাষ্ট্র আইএমওতে ইরানের বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করলেও রাশিয়া ও চীন তা সমর্থন করেনি। রাশিয়ার মতে, প্রস্তাবটি সংকটের প্রকৃত কারণকে যথাযথভাবে বিবেচনায় নেয়নি। চীনের ভাষ্য, এটি একপেশে এবং আইএমওর এখতিয়ারের বাইরের বিষয়।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু দুটি প্রশ্ন। প্রথমটি হলো, হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে চালু হওয়ার পর এর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কী হবে। দ্বিতীয়টি দীর্ঘমেয়াদে প্রণালির প্রশাসনিক কাঠামো কেমন হবে এবং মালাক্কা প্রণালির সহযোগিতামূলক মডেল ইরানের জন্য গ্রহণযোগ্য হবে কি না।
গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে ইরান ৬০ দিনের জন্য অতিরিক্ত কোনো ফি ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাখ্যা, এর অর্থ এই নয় যে, ইরানের অনুমোদন ছাড়া কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে পারবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, মে মাসের শুরু থেকে তাদের বাহিনী ৮০০টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং প্রায় ৩৮ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম নিশ্চিত করতে সহায়তা করেছে। অন্যদিকে আইআরজিসি নৌবাহিনীর দাবি, সমঝোতা অনুযায়ী তারা নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছে এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদেশি সামরিক বাহিনীর কোনো ভূমিকার প্রয়োজন নেই।