দেশীবার্তা অনলাইন

ইউপি নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে সরকার-ইসির মতপার্থক্য
স্থানীয় সরকার নির্বাচন, বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মধ্যে সমন্বয়হীনতার বিষয়টি সামনে এসেছে।
সোমবার ইসি সাত ধাপে ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণা করে জানায়, এটি প্রাথমিক সিদ্ধান্ত। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে বৈঠকের পর তারিখ চূড়ান্ত করা হবে।
এরপর মঙ্গলবার স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে সরকারের সঙ্গে ইসির কোনো আলোচনা হয়নি। তবে পরে ইসি সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ জানান, ঘোষিত সময়সূচি প্রাথমিক এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করেই তা চূড়ান্ত করা হবে।
ইসি সূত্র জানিয়েছে, আইন অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণের এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের। এ ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে তফসিল চূড়ান্ত করার বাধ্যবাধকতা নেই। তবে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, নির্বাচনের আগে ইসি ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়ে থাকে।
এবার এখনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। তবে নির্বাচনের উপযোগী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সীমানা বা আইনি জটিলতার তথ্য চেয়ে গত জুলাইয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিল ইসি। এর জবাবে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা-সংক্রান্ত তথ্য দেওয়া হলেও সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার কিছু তথ্য এখনো ইসি পায়নি।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে ইসির মধ্যে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ঘোষিত দুটি ধাপের ভোটের তারিখ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে ইসির অবস্থান হলো, আইনগত এখতিয়ার অনুযায়ীই সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণা করা হয়েছে এবং এতে তাদের কোনো ত্রুটি হয়নি।
ইউপি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার বিষয়ে সরকার কিছু জানে না। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও কিছু জানে না। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সরকারের এ বিষয়ে কোনো চিঠি-চালাচালি হয়নি। অন্য কোনো মাধ্যমে আলোচনাও হয়নি
মীর শাহে আলম, প্রতিমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়
ইউপি নির্বাচনের সাত ধাপের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করেছে ইসি। প্রথম ধাপে ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপে ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপে ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপে ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপে ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপে আগামী বছরের ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ধাপে ২৭ মে ভোটের সম্ভাব্য দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে কয়েকটি তারিখ নিয়ে আপত্তি ও জটিলতা দেখা দিয়েছে। ৩০ ডিসেম্বর বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী হওয়ায় ওই দিন ভোটের সম্ভাব্য তারিখ রাখায় বিএনপির কয়েকজন নেতা অনানুষ্ঠানিকভাবে ইসির কাছে আপত্তি জানিয়েছেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
এ ছাড়া ১৩ ডিসেম্বর জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষার গণিত পরীক্ষা থাকায় ওই দিন ভোট আয়োজন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পরীক্ষা চলাকালে ভোট আয়োজনের নজির না থাকায় পরীক্ষার সময়সূচি পরিবর্তন না হলে ওই তারিখে নির্বাচন করা সম্ভব হবে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর দাবি, ইসি আলোচনা করেনি
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণার আগে সরকারের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কোনো আলোচনা হয়নি। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে কিছু জানে না বলে দাবি করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ইসি স্বাধীন এবং নির্বাচন পরিচালনার সাংবিধানিক ক্ষমতা তাদের রয়েছে। তবে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে সরকারের সঙ্গে আলোচনা, প্রস্তুতি সভা ও আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বৈঠক হয়ে থাকে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসি ও সরকার সমন্বয়ের মাধ্যমে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘শিরোধার্য’ বললেন ইসি সচিব
ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের সময় ও পদ্ধতি নিয়ে কমিশনে দুই দিন প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে এবং এর ভিত্তিতেই সোমবার সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণা করা হয়। তবে এটি চূড়ান্ত নয়।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে তিনি বলেন, তাঁর বক্তব্য ‘শিরোধার্য’ এবং এ বিষয়ে পাল্টা মন্তব্য করতে চান না। সরকারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে কি না—এ প্রশ্নে ইসি সচিব বলেন, আলোচনা একটি চলমান প্রক্রিয়া; এ মুহূর্তে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করবেন না।
এনসিপির ক্ষোভ ও প্রতিবাদ
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভূমিকা এবং সরকারের হস্তক্ষেপ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এনসিপি। এক বিবৃতিতে দলটি দাবি করেছে, স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসির নিজস্ব সিদ্ধান্ত ও অবস্থান থাকা উচিত।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘শিরোধার্য’ বলার ঘটনায় ইসি সচিবের ভূমিকার সমালোচনা করে এনসিপি বলেছে, এতে কমিশনের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। দলটির অভিযোগ, সরকারি প্রভাব ও চাপের কারণে ইসি বিভিন্ন সময়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিচ্ছে, যা নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
এনসিপি ইসিসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্বাহী বিভাগের কথিত ‘অবৈধ প্রভাব ও অগণতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ’ বন্ধের দাবি জানিয়েছে।
এখতিয়ার ইসির
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ও সংসদ নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। পাশাপাশি সংবিধান বা আইনের মাধ্যমে অর্পিত অন্যান্য দায়িত্বও কমিশন পালন করে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনসংক্রান্ত আইনেও নির্বাচন পরিচালনার ক্ষমতা ইসিকে দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ আইনের ২০ ধারায় বলা হয়েছে, ইসি প্রণীত বিধি অনুযায়ী চেয়ারম্যান ও সদস্য নির্বাচন আয়োজন, পরিচালনা ও সম্পন্ন করবে কমিশন। একই ধারায় ভোটের তারিখ, সময়, স্থান এবং নির্বাচন পরিচালনার অন্যান্য বিষয়ে বিধান করার ক্ষমতাও ইসিকে দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা পরিষদ আইনেও একই ধরনের বিধান রয়েছে। ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণ ও নির্বাচন পরিচালনায় ইসির আইনগত এখতিয়ার রয়েছে।