“আজকের বাংলাদেশ আগের সেই বাংলাদেশ আর নেই” — হুমায়ুন কবির

২৮

কূটনৈতিক প্রতিবেদক ,ঢাকা।

“আজকের বাংলাদেশ আগের সেই বাংলাদেশ আর নেই” — হুমায়ুন কবির
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। আজ সোমবার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়

পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির মন্তব্য করেছেন যে, সীমান্ত ইস্যুতে বাংলাদেশ আর আগের মতো নরম অবস্থানে নেই। তিনি বলেন, বর্তমান বাংলাদেশ আত্মমর্যাদাশীল ও দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। দেশের জনগণ কিংবা সরকার কেউই সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়াকে ভয় পায় না। একই সঙ্গে তিনি জানান, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব পরিকল্পনাও রয়েছে।
সোমবার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকার বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ জোরদারের ঘোষণা দেয়। হাওড়ায় রাজ্য সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে সীমান্ত এলাকায় প্রয়োজনীয় জমি বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এ কাজ বাস্তবায়নে মুখ্য সচিব এবং ভূমি ও রাজস্বসচিবকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে সামনে এগিয়ে নিতে হলে উভয় দেশের নেতৃত্বের ইতিবাচক মানসিকতা প্রয়োজন। তিনি স্বীকার করেন, দুই দেশের মধ্যে কিছু জটিল ও সংবেদনশীল ইস্যু রয়েছে, তবে আলোচনার পথ খোলা থাকলে সেগুলোর সমাধানের সম্ভাবনাও থাকে। তাঁর মতে, কিছু সমস্যা দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হলেও কিছু বিষয়ে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গে নবগঠিত সরকারের নির্বাচনী প্রচারণার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় অনেক রাজনৈতিক দলই উগ্র বা কঠোর ভাষা ব্যবহার করে থাকে। তবে সরকার পরিচালনা করা এবং নির্বাচনী বক্তব্য দেওয়া এক বিষয় নয়। তাই নতুন সরকার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কী ধরনের অবস্থান নেয়, সেটি দেখার জন্য কিছুটা সময় দেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

হুমায়ুন কবির আরও বলেন, বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে পরিচালিত হয়। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে বাংলাদেশ হস্তক্ষেপ করতে চায় না।

* বাংলাদেশ কাঁটাতারের বেড়ার ভয় পায় না
* তিস্তায় চীনের এক্সিম ব্যাংক অর্থায়ন করবে

প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, কাঁটাতারের বেড়া দেখিয়ে বাংলাদেশের মতো একটি দেশকে ভয় দেখানোর সুযোগ নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জনগণ কিংবা সরকার কেউই সীমান্তের কাঁটাতারকে ভয় পায় না। প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ যথাযথভাবে নিজের অবস্থান তুলে ধরবে বলেও তিনি জানান।

তিনি আরও বলেন, দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করতে হলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় ভারতকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। হুমায়ুন কবিরের মতে, শেখ হাসিনার আমলে সীমান্তে যে ধরনের পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল, ভবিষ্যতে সেই চিত্র আর ফিরে আসবে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, কেউ যদি আগের ধাঁচে সীমান্তে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে বর্তমান বাংলাদেশ তা নীরবে মেনে নেবে না। এ বিষয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর উচিত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা। বাংলাদেশও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। তবে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ থাকবেই। এ সময় তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, তিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন এবং বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার কোনো সুযোগ তাঁকে দেওয়া উচিত হবে না। ভারত সরকার এ বিষয়ে ইতিবাচক আশ্বাস দিয়েছে বলেও জানান তিনি।

তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, আগে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের অবস্থানের কারণে চুক্তি বাস্তবায়নে জটিলতার কথা বলত। কিন্তু এখন পশ্চিমবঙ্গ ও কেন্দ্র—উভয় জায়গাতেই বিজেপি সরকার রয়েছে। ফলে আলোচনায় অগ্রগতি হওয়ার ক্ষেত্রে আগের তুলনায় কম বাধা থাকবে বলে বাংলাদেশ আশা করছে।

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং ঐতিহাসিক। নতুন সরকারের এটি প্রথম বেইজিং সফর এবং উভয় দেশই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে আগ্রহী। তাঁর মতে, নতুন নেতৃত্বের অধীনে দুই দেশের সম্পর্ক আরও উচ্চতায় পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তিস্তা প্রকল্পে সহযোগিতার বিষয়ে তিনি জানান, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তিস্তা প্রকল্প নিয়েও ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে এবং এতে চীনের এক্সিম ব্যাংক অর্থায়নে আগ্রহ দেখিয়েছে।

তিস্তা প্রকল্পের কাজ কবে শুরু হতে পারে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, প্রকল্পটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমানে সমীক্ষা প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং এ নিয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগবে বলে তিনি জানান।

প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য চীন সফর এবং ওই সফরে তিস্তা–সংক্রান্ত কোনো চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, সফরের সময়সূচি এখনো নির্ধারিত হয়নি। প্রধানমন্ত্রী কবে এবং কোন দেশ সফর করবেন, তা চূড়ান্ত হলে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবে। তবে চীন বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অংশীদার হওয়ায় ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সুবিধাজনক সময় ও পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে সফরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *