দেশীবার্তা অনলাইন।

জুলাই আন্দোলনের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে আবু সাঈদের পরিবার, সহযোদ্ধা, সহপাঠী ও এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁর আত্মত্যাগের স্মৃতি এখনো স্বজনদের মনে গভীরভাবে জাগ্রত। ছেলের ছবি হাতে নিয়ে মা মনোয়ারা বেগম প্রায়ই কবরের কাছে যান এবং আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। পরিবারের সদস্যদের কাছেও আবু সাঈদের স্মৃতি আজও আগের মতোই জীবন্ত ও অম্লান।
ছেলের ছবি হাতে নিয়ে কবরের পাশে গিয়ে এখনো অঝোরে কাঁদেন জুলাইবিপ্লবে প্রথম শহীদ আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম। প্রিয় ছেলের মায়াভরা মুখ প্রতিনিয়ত ভেসে ওঠে তার মনে। পরিবারের সদস্যরাও তার স্মৃতি কিছুতেই ভুলতে পারছেন না।
মেধাবী আবু সাঈদকে নিয়ে অনেক আশা ও স্বপ্ন ছিল পরিবারের। কিন্তু সেই আশা ও স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দিয়েছে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের পেটোয়াবাহিনী। জুলাই-বিপ্লব চলাকালে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা করে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আওয়ামী পুলিশ। আবু সাঈদ হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করে মামলার রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছে পরিবার। একই সঙ্গে তারা আবু সাঈদের স্বপ্ন ও চাওয়াকে বাস্তবায়ন করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা। কারণ তার স্বপ্ন বাস্তবায়িত না হলে জুলাই আন্দোলনের সফলতা ম্লান হয়ে যাবে।
আবু সাঈদের সহযোদ্ধা সুমন, ইমরান ও ইমতিসহ সহপাঠীরা জানান, জুলাই-বিপ্লবের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ। তার আত্মত্যাগ এবং শহীদ হওয়া সারা দেশের জুলাইযোদ্ধাদের আরো এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছে। সে ছিল জুলাই আন্দোলনের আইডল। তার ঋণ কেউ শোধ করতে পারবে না। কোনোকিছু দিয়ে তার ঋণ শোধ হবে না। তাই আবু সাঈদের স্বপ্নকে ধরে রাখার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছে তার সহযোদ্ধারা।
তারা আবু সাঈদসহ অন্যান্য শহীদদের হত্যাকারী এবং হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে বলেন, আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের মামলায় যে রায় দেওয়া হয়েছে, সেখানে আশার প্রতিফলন ঘটেনি। যারা হত্যাকাণ্ডে প্ররোচনা ও উৎসাহ দিয়েছে, তাদেরও কঠিন শাস্তি দেওয়া উচিত ছিল। পাশাপাশি যারা এখনো পলাতক, তাদের গ্রেপ্তার করে দ্রুত রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত শহীদ পরিবারের সদস্যদের মনে শান্তি ফিরে আসবে না।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) সংলগ্ন মডার্ন মোড়ের আখতার হোসেন ও ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম বলেন, মেধাবী আবু সাঈদকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। সে অত্যন্ত ভদ্র মার্জিত ছেলে ছিল। কারো সঙ্গে কখনো তার কথা কাটাকাটি হয়েছেন এমনটি আমাদের কানে আসেনি। জুলাইবিপ্লবে আবু সাঈদের আন্দোলনে সমর্থন এবং ছাত্র-জনতাকে উৎসাহিত করতাম। আবু সাঈদকে ফ্যাসিবাদী সরকারের পেটোয়া বাহিনী গুলি করে হত্যা করবে এটা কখনো ভাবিনি। যারা তাকে হত্যা করেছে এবং সেই হত্যাকাণ্ডে যারা প্ররোচনা দিয়েছে, তাদেরও আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের চাওয়া আবু সাঈদের মামলার রায় দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
শহীদ আবু সাঈদের বড় ভাই ও হত্যা মামলার বাদী রমজান আলী দেশীবার্তাকে বলেন, আবু সাঈদ হত্যা মামলায় কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড হলেও এখন পর্যন্ত সেই রায় কার্যকর হতে দেখছি না। প্রথম শহীদের বিচারই যদি দ্রুত কার্যকর না হয়, তাহলে অন্য শহীদদের পরিবার কীভাবে বিচার পাবে? আমরা দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানাই।
শহীদ আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আজ যদি আমার ছেলে বেঁচে থাকত, তাহলে সে আমার কাছে আসত, আমাকে মা বলে ডাকত। জীবনে অনেক কিছু পেলেও ছেলেকে হারিয়ে আমি নিজেকে নিঃস্ব মনে করি। আমার সন্তানের হত্যাকারীদের দ্রুত বিচার কার্যকর হোক—এটাই আমার একমাত্র দাবি।’
বাবা মকবুল হোসেন বলেন, ‘আমার ছেলে বেঁচে থাকলে চাকরি করত, আমার চোখের সামনে থাকত। তাহলে আমার এত কষ্ট থাকত না। ছেলেকে হারানোর বেদনা আজও বুকে নিয়ে বেঁচে আছি। যাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে, সেই রায় যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের তাজহাট থানার ওসি আতাউর রহমান আমার দেশকে জানান, আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের রায় যেহেতু ট্রাইব্যুনালে হয়েছে, তাই সে বিষয়ে মন্তব্য করার সুযোগ নেই। তবে যারা পলাতক রয়েছে, তাদের বিষয়ে আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত কোনো ওয়ারেন্ট আসেনি। ট্রাইব্যুনাল আমাদের যেভাবে নির্দেশনা দেবে, আমরা সেভাবেই কাজ করব।
তিনি আরো বলেন, আমরা আবু সাঈদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পাশাপাশি তার স্মৃতিগুলো ধরে রাখব। যাতে পরবর্তী প্রজন্ম জানতে পারে, আবু সাঈদের কারণে নতুন করে বাংলাদেশ আলোর মুখ দেখেছে।