দেশী বার্তা অনলাইন।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে পারস্পরিক সহযোগিতার উপযোগী পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে ঢাকা। এ বিষয়ে ভারতকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।
সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকটি ছিল দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ।
সাক্ষাৎ শেষে বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে তিনি জানান, দুই দেশের সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও ইতিবাচক পর্যায়ে নিতে প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরির বিষয়টি বৈঠকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে একটি ‘সহায়ক পরিবেশ’ প্রয়োজন। সেই পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে উভয় দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ বলে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে নিয়মিত যোগাযোগ, পারস্পরিক আস্থা এবং সহযোগিতার সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভারতের ইতিবাচক ভূমিকা প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদারের ক্ষেত্রে এই বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা ও সহযোগিতা আরও বাড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে দিল্লির সহযোগিতা চেয়েছে ঢাকা। একই সঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজনদেরও বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, বৈঠকে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়টি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।
এ ছাড়া শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সন্দেহভাজন কয়েকজন আসামি ভারতে আটক হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। তাদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে ভারতের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অভিযুক্তদের প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারত যেসব নথি ও কাগজপত্র চেয়েছিল, বাংলাদেশ সেগুলো সরবরাহ করেছে। হাদি হত্যাকাণ্ডকে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যাকাণ্ড এবং ভারত থেকে বাংলাদেশে কথিত ‘পুশ ইন’-এর বিষয়টিও উঠে আসে। এ প্রসঙ্গে খলিলুর রহমান জানান, বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তবে তা ছিল সংক্ষিপ্ত পরিসরে।
তিনি বলেন, সীমান্ত হত্যা বা পুশ ইন-এর মতো বিষয় সাধারণত প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনার বিষয় নয়। এসব বিষয়ে এর আগেও কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে এবং ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকেও সংক্ষেপে বিষয়গুলো উত্থাপন করা হয়েছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় অনুকূল পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে ভারতের সহযোগিতা প্রত্যাশা করা হয়েছে বলেও জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
গত ৫ আগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের কাছে বাংলাদেশের অসন্তোষের কথা জানিয়ে একটি চিঠি পাঠানোর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, ৫ আগস্টের ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান আগেই স্পষ্টভাবে ভারতকে জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে ভারতের কাছে তুলে ধরা হয়েছে এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, আগের দিন ভারতীয় পক্ষ তাকে এ বিষয়ে তাদের অবস্থানের কথা জানিয়েছে এবং পরদিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছে।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে ভারত কোনো ধরনের দুঃখ প্রকাশ করেছে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টিকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করেন।
খলিলুর রহমান বলেন, এখানে সরাসরি ‘দুঃখ প্রকাশ’-এর প্রশ্নটি প্রযোজ্য নয়। বিষয়টি বুঝতে হলে রাষ্ট্রের কাঠামো এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্রের মূল তিনটি অঙ্গ হলো নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা এবং বিচার বিভাগ। শেখ হাসিনা যেহেতু একটি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন, তার বিষয়টি এখন বিচার বিভাগের আওতাধীন। বাংলাদেশের একটি আদালত তাঁর বিচার করে সাজা ঘোষণা করেছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, কোনো ব্যক্তি আদালতের রায়ে দণ্ডিত হলে তাকে আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় নেওয়া হয়। তাঁর বক্তব্য বা আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো বিষয় থাকলে তা আদালতেই উপস্থাপনের সুযোগ রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির বক্তব্য বা অবস্থান প্রকাশের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যেই বিবেচনা করা উচিত। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৫ আগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে উদ্বেগ ও আপত্তি জানানো হয়েছে, সেটিও ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে স্পষ্টভাবে অবহিত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
৫ আগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের প্রতি বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়টি তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, ওইদিন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য বাংলাদেশের বিচার বিভাগের প্রতি নেতিবাচক অবস্থান তৈরি করেছে বলে মনে করে ঢাকা। তাঁর অভিযোগ, ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে এমন বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে অবমূল্যায়নের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিটি স্তম্ভের প্রতি সব দেশের সম্মান থাকা প্রয়োজন। এ বিষয়ে ভারতের কাছ থেকেও একই ধরনের দায়িত্বশীল অবস্থান প্রত্যাশা করছে ঢাকা।
খলিলুর রহমান জানান, বিষয়টি ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কে ভারতীয় পক্ষ অবগত হয়েছে এবং বিষয়টির গুরুত্বও তারা অনুধাবন করেছে বলে তাঁর ধারণা।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কোনো প্রতিষ্ঠান বা অঙ্গকে খাটো করে এমন কোনো পরিস্থিতি যেন সৃষ্টি না হয়, সেটিই বাংলাদেশের প্রত্যাশা। ভারতীয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনার পর এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না বলে তিনি কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছেন বলেও জানান।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে পারস্পরিক সম্মান ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের নীতির ভিত্তিতেই বাংলাদেশ ভবিষ্যতে ভারতসহ সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে চায়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের জন্য দুই দফা আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে কি না এবং সেই আমন্ত্রণ বাংলাদেশ গ্রহণ করেছে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, এ বিষয়ে এখনই কোনো সিদ্ধান্ত জানানো সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ভবিষ্যৎ সফর বা আমন্ত্রণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার অবস্থানে তিনি নেই। একই সঙ্গে ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তুলে ধরেন তিনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ব্রিকসের সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। বরং বাংলাদেশ বর্তমানে বিমসটেকের চেয়ারপারসনের দায়িত্বে থাকায় সেই পরিচয়ে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
খলিলুর রহমান বলেন, বিষয়টি দুইভাবে দেখার সুযোগ নেই এবং ব্রিকসের আমন্ত্রণ ও বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবে আমন্ত্রণ—এই পার্থক্যটি পরিষ্কারভাবে বোঝা প্রয়োজন।
তিনি আরও জানান, এর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দিন একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। ওই চিঠির মাধ্যমে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ফলে ভারতের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ যে রয়েছে, তা নিশ্চিত করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
এদিকে সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সাক্ষাতের সময় দিল্লি সফরের আমন্ত্রণের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সফর নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে যাবেন কি না, কিংবা আমন্ত্রণটি কখন গ্রহণ করা হবে—এসব বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি পরবর্তী সময়ে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।