দেশীবার্তা। অনলাইন ।

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যা মামলায় সাড়ে ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও অভিযোগপত্র দাখিল না হওয়াকে বিচারব্যবস্থার দুর্বলতার দৃষ্টান্ত বলে মন্তব্য করেছেন নিহত ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি।
শনিবার সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ত্বকী হত্যার ১৬১ মাস পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত মোমশিখা প্রজ্বালন কর্মসূচিতে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।
রফিউর রাব্বি বলেন, শেখ হাসিনা দীর্ঘ সাড়ে ১১ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে ত্বকী হত্যার বিচার কার্যক্রম বন্ধ ছিল। তাঁর সরকারের পতনের পর প্রায় দুই বছর অতিবাহিত হলেও বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রত্যাশিত পরিবর্তন দেখা যায়নি। সরকার পরিবর্তন হলেও বিচারব্যবস্থায় মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসেনি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, একটি সভ্য সমাজে কোনো হত্যাকাণ্ডের বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকতে পারে না। ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারকে দীর্ঘ অপেক্ষায় রাখার বিষয়টি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগজনক।
২০১৩ সালে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই হত্যার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট।
এরই ধারাবাহিকতায় প্রতি মাসের ৮ তারিখে নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মোমশিখা প্রজ্বালন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। ১৬১ মাস পূর্তিতেও একই কর্মসূচির মাধ্যমে ত্বকী হত্যার বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার দাবি জানানো হয়।
কর্মসূচিতে সাংস্কৃতিক জোটের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। বক্তারা দীর্ঘদিন ধরে বিচারপ্রক্রিয়া ঝুলে থাকার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দাখিল এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।
বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ, ত্বকী হত্যার দ্রুত বিচার দাবি
নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মনি সুপান্থর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মসূচিটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক দিনা তাজরীন। এতে বক্তব্য রাখেন সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের সদস্যসচিব হালিম আজাদ, দৈনিক খবরের পাতার সম্পাদক মাহবুবুর রহমান, শিশুসংগঠক রথীন চক্রবর্তী, ন্যাপের নারায়ণগঞ্জ জেলা সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন, বাসদের জেলা সদস্যসচিব আবু নাইম খান, নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল হকসহ সাংস্কৃতিক ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা।
এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি ভবানী শংকর রায়, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ধীমান সাহা এবং গণসংহতি আন্দোলনের নির্বাহী সমন্বয়ক অঞ্জন দাসও বক্তব্য দেন।
কর্মসূচিতে রফিউর রাব্বি বলেন, ত্বকী হত্যার প্রায় এক বছর পর তদন্তকারী সংস্থা র্যাব তদন্ত শেষ করার কথা জানিয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল হয়নি। এর মধ্যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একাধিকবার সরকার পরিবর্তন হলেও ত্বকী হত্যার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
তিনি আরও বলেন, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিচারব্যবস্থায় প্রত্যাশিত সংস্কারও আসেনি। ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীরা ন্যায়বিচারের দাবিতে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগান দিয়ে রাজপথে নেমেছিল। কিন্তু সেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রফিউর রাব্বি বলেন, ত্বকী হত্যার পাশাপাশি সাগর-রুনি, তনুসহ বিভিন্ন আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচারও তারা চান। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের আন্দোলনে নিহতদের হত্যারও বিচার দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিচার ঝুলে থাকা কোনোভাবেই একটি সভ্য সমাজের স্বাভাবিক চিত্র হতে পারে না। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে এবং হত্যাকাণ্ডগুলোর দ্রুত বিচার সম্পন্ন করতে হবে।
যেভাবে হত্যার শিকার হন ত্বকী
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জ নগরের শায়েস্তা খাঁ সড়কের বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। নিখোঁজের দুই দিন পর শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনী খাল থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালের ৫ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে তদন্তকারী সংস্থা র্যাব জানায়, নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের নির্দেশে একটি নির্দিষ্ট স্থানে ১১ জন মিলে ত্বকীকে হত্যা করেছে। একই সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত শেষ করে দ্রুত আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।
তবে সেই ঘোষণার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মামলার অভিযোগপত্র এখনো আদালতে দাখিল হয়নি। এ কারণে ত্বকী হত্যার বিচার নিয়ে নিহতের পরিবার ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে।