দেশীবার্তা অনলাইন

সুইস ব্যাংকিং খাতে গোপনীয়তার ঐতিহ্য মূলত ১৯৩৪ সালে প্রণীত সুইস ব্যাংকিং আইনের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। এই আইনে গ্রাহকদের আর্থিক তথ্য প্রকাশের বিষয়ে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ফলে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জমাকৃত অর্থ বা সম্পদের বিবরণ সাধারণত জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় না।
সুইজারল্যান্ডের প্রতি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের আগ্রহের পেছনে রয়েছে দেশটির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশ এবং আধুনিক আর্থিক ব্যবস্থা। এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে অনেকেই সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সুইস ব্যাংককে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন।
অ্যাসোসিয়েশন অব সুইস প্রাইভেট ব্যাংকার্সের সাবেক প্রধান মিশেল ডি রবার্ট এক সাক্ষাৎকারে বলেন, চিকিৎসক ও আইনজীবীদের মতো ব্যাংকারদেরও গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখার পেশাগত ও আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রাহকের অনুমতি ছাড়া এসব তথ্য প্রকাশ করা আইনের পরিপন্থী।
বর্তমানে সুইজারল্যান্ডে তিন শতাধিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে ইউবিএস এবং ক্রেডিট সুইস বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত ব্যাংকিং ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত। তবে সুইস ব্যাংক নিয়ে প্রচলিত সবচেয়ে বড় ধারণাগুলোর একটি হলো, সেখানে পরিচয় গোপন রেখে সহজেই অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। বাস্তবে বর্তমান ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এমন সুযোগ নেই।
সুইস ব্যাংকে হিসাব খুলতে গ্রাহকের পরিচয় যাচাই করা বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে অর্থের উৎস সম্পর্কিত তথ্য জমা দিতে হয় এবং কঠোর ‘নো ইউর কাস্টমার’ (কেওয়াইসি) নীতিমালা মেনে চলতে হয়। ফলে সম্পূর্ণ বেনামি পরিচয়ে ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের সুযোগ কার্যত বিলুপ্ত হয়েছে।
সুইস ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, কিছু হিসাব নম্বরভিত্তিকভাবে পরিচালিত হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নির্দিষ্ট কর্মকর্তারা গ্রাহকের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে অবগত থাকেন। তাই ‘নাম-পরিচয়হীন অ্যাকাউন্ট’ সংক্রান্ত প্রচলিত ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়।
গত কয়েক দশকে সুইস ব্যাংকিং খাতের গোপনীয়তা নীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। কর ফাঁকি, অর্থ পাচার এবং অবৈধ সম্পদ গোপনের অভিযোগ ঘিরে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তথ্য বিনিময় ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে সুইজারল্যান্ড।
এদিকে, বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি বা অবৈধ সম্পদ সংশ্লিষ্ট অভিযোগে অভিযুক্ত বিশ্বের নানা দেশের রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অর্থ সুইস ব্যাংকে জমা থাকার তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। এসব ঘটনার পর বৈশ্বিক পর্যায়ে অর্থ পাচারবিরোধী কার্যক্রম আরও জোরদার হয় এবং সুইস ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অধিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি নতুন করে গুরুত্ব পায়।
সুইস ব্যাংকিং খাতের বিকাশের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ইতিহাস। গ্রাহকদের আর্থিক তথ্য সুরক্ষিত রাখতে ১৯৩৪ সালে সুইজারল্যান্ডে বিশেষ ব্যাংকিং আইন কার্যকর করা হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, এর আগে কয়েকজন ফরাসি রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীর ব্যাংক হিসাবসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ্যে চলে আসার ঘটনাই এমন আইন প্রণয়নের অন্যতম প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময় এবং নাৎসি জার্মানির উত্থানের পর নিরাপদে সম্পদ সংরক্ষণের উপযোগী স্থান হিসেবে সুইস ব্যাংকের প্রতি আন্তর্জাতিক আগ্রহ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিকভাবে নিজেদের আর্থিক কাঠামো শক্তিশালী করে সুইজারল্যান্ড বিশ্ব ব্যাংকিং খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
বর্তমানে সুইস ব্যাংকের আকর্ষণ কেবল তথ্যের গোপনীয়তায় সীমাবদ্ধ নেই। সম্পদ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশ, শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের বহুমুখী সুযোগ-সুবিধা বিশ্বের ধনী ব্যক্তি ও বিনিয়োগকারীদের কাছে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকিং খাতকে বিশেষভাবে জনপ্রিয় করে তুলেছে।