প্রতিনিধি বাগেরহাট

শুক্রবার বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের পুটিয়া গ্রামে নারীদের কাছে ভোট ও আশীর্বাদ চান ধানের শীষের প্রার্থী সোমনাথ দে।
আজ শুক্রবার, সময় দুপুর পৌনে ১২টা। চায়ের দোকানে বসা কয়েকজন মধ্যবয়সী মানুষের আলোচনায় তখন তীব্র উত্তাপ। বিষয় একটাই—ভোট। খদ্দেরদের সঙ্গে বিক্রেতাও যোগ দিয়েছেন কথার ঝড়ে। যেন কথার লড়াই চলছে। সড়কের বিপরীত পাশে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখতে দেখতে মনে হলো, গিয়ে চায়ের দোকানেই বসা যাক। ঠিক তখনই সড়কের পশ্চিম দিক থেকে হর্ন বাজিয়ে এগিয়ে এল একটি মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা। স্লোগান ভেসে আসছে— ‘মার্কা কী আছে, কোন সে মার্কা—ধানের শীষ’, ‘ভোট দিবেন কিসে—ধানের শীষে’। ১৮ থেকে ২০টি মোটরসাইকেলের পেছনে ছিল একটি ছাদখোলা গাড়ি। সেখান থেকে দাঁড়িয়ে সড়কের দুই পাশে হাত নাড়ছিলেন বিএনপির প্রার্থী সোম নাথ দে। পেছনে আরও তিনটি গাড়ি। শোভাযাত্রাটি বাঁক ঘুরে চলে যেতেই রাস্তা পার হয়ে চায়ের দোকানে গিয়ে বসলাম। বনগ্রাম ইউনিয়নটি বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত। পাশের শরণখোলা উপজেলা মিলিয়ে এই এলাকা বাগেরহাট–৪ সংসদীয় আসনের অংশ। ইউনিয়নের মাঝ দিয়ে চলে গেছে বাগেরহাট–পিরোজপুর মহাসড়ক। দক্ষিণ দিকে রাস্তার পূর্বপাশের চায়ের দোকানে এক কাপ চা অর্ডার করলাম—আলোচনা শোনার অজুহাতে। কথাবার্তা শুনে জানা গেল, দোকানে বসা লোকজনের মধ্যে বিএনপির তিনজন নেতা রয়েছেন। প্রার্থীর সঙ্গে শোভাযাত্রায় না গিয়ে তাঁরা এখানে বসে আছেন—এর কারণও জানা গেল কিছুক্ষণ পর। প্রার্থী যাঁদের সঙ্গে নিয়েছেন, তাঁদের পছন্দ নয় সেখানে থাকা এই নেতাদের। পরিচয় জানতে চাইলে একজন নিজেকে শ্রমিক দলের সাবেক নেতা বলে জানান। আরেকজন বলেন, তিনি স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ছিলেন। কথায় খোঁচা দিয়ে শ্রমিক দলের ওই নেতা বলেন, ‘আমরা যাব কেন, সাথে গেইছে সব নব্য লোকেরা…।’ আলোচনা চলতেই থাকে। কেউ বলেন, দলের বাইরে ভোট দেবেন না। কেউ আবার ভোটই দেবেন না। আরেকজন জানান, স্বতন্ত্র প্রার্থীকে ভোট দেবেন। দোকানদার মন্তব্য করেন, ‘সবাইরে দেখছি, ভোট দেব দাঁড়িপাল্লায়।’ এর জবাবে আরেকজন বলেন, ‘ভোট তো ঠিকই ধানের শীষে দেবা, জানি।’ প্রার্থীর সঙ্গে না থাকলেও অন্তত দুজন নেতা জানান, শেষ পর্যন্ত তাঁরা ভোট দেবেন দলের প্রতীকেই। এই আলোচনা থেকে বিদায় নিয়ে প্রার্থীর গাড়িবহরের পিছু নিলাম। বহরটি বনগ্রাম ইউনিয়নের বউ বাজারের দিকে যায়। শ্রীপুর ও জয়পুর গ্রামের পিচঢালা পথ ধরে এগোয় গাড়িগুলো। বউ বাজারে দাঁড়িয়ে প্রার্থী লিফলেট বিতরণ করেন এবং ভোটারদের কাছে দোয়া চান। পরে তিনি যান শৈলখালী বাজারে। সেখানেও লিফলেট বিতরণ ও প্রচারণা চলে। তবে স্থানীয় লোকজনের তুলনায় মোরেলগঞ্জ থেকে আসা কর্মীর সংখ্যাই ছিল বেশি। সেখান থেকে গ্রামের পথ ধরে গাড়িবহর পৌঁছে যায় ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পুটিয়া গ্রামে। সেখানে ‘মায়ের বাড়ি মন্দির’ (কালীকন্দির)–এ গিয়ে প্রণাম করেন ধানের শীষের প্রার্থী সোম নাথ দে। পরে মন্দিরের পুরোহিতের বাড়িতে এবং পাশের কয়েকটি পরিবারের নারী সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন, দোয়া ও আশীর্বাদ চান। নামাজের সময় হওয়ায় কিছুক্ষণ বিরতি নেন প্রার্থী ও তাঁর কর্মীরা। এরপর সবাই ফিরে যান বলভদ্রপুর এলাকার দলীয় প্রার্থী কার্যালয়ে। বনগ্রাম ইউনিয়নের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই হিন্দু সম্প্রদায়ের। পুটিয়া, কড়াবৌলা ও বান্টিপুর গ্রাম নিয়ে গঠিত ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জনসংখ্যার অর্ধেক হিন্দু—জানান গ্রামের তরুণ সৌরভ চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ভোটের পরিবেশ ভালো। সবাই নিজ নিজভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তাঁদের গ্রামে এই প্রথম কোনো দলের প্রার্থী সরাসরি এসে ভোট চাইছেন। অন্য দলগুলোর নেতা–কর্মীরা শুধু মাইকিং ও লিফলেটেই সীমাবদ্ধ ছিলেন। গ্রামের অন্তত ১১ জন নারী ও ৭ জন পুরুষ ভোটারের সঙ্গে কথা হয়। তাঁদের মতে, ভোটের লড়াই মূলত বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির কিছু ভোট কেটে নিতে পারেন। হিন্দু ভোটারদের ভাষ্য, যাঁরা তাঁদের পাশে থাকবেন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন, তাঁরাই তাঁদের ভোট পাবেন। নির্যাতন বা নিপীড়নের শিকার না হওয়ার নিশ্চয়তা চান তাঁরা। প্রচারে ভালো সাড়া পাওয়ার কথা জানিয়ে সোম নাথ দে দেশী বার্তাকে বলেন, ‘আজ এই এলাকায় আমার প্রচারণা। সকালে মোরেলগঞ্জ ফেরিঘাটসহ পথে পথে লিফলেট বিতরণ করেছি। বিকেলে পাশের হোগলাপাশা ইউনিয়নের বৌলপুর বাজারে নির্বাচনী জনসভা রয়েছে।’ বাগেরহাট–৪ আসনে নতুন মুখ হিসেবে ধানের শীষের মনোনয়ন পেয়েছেন মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্য জোটের সভাপতি সোম নাথ দে। জাতীয় পার্টি ও পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার পর গত বছর তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। এই আসনে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মো. আবদুল আলীম এবং বহিষ্কৃত জেলা বিএনপির সদস্য কাজি খায়রুজ্জামান শিপন (হরিণ)। স্থানীয় ভোটারদের মতে, বিএনপির ভোট ভাগ হলে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে জামায়াত। যদিও ইসলামী আন্দোলন, জাসদ ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী থাকলেও তাঁদের নিয়ে ভোটারদের মধ্যে তেমন আলোচনা নেই।