প্রাচীন নিদর্শনগুলো রক্ষণাবেক্ষণের দাবি

রাজশাহীর বাঘা শাহী মসজিদ একটি ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। ৫০০ বছর আগে এটি নির্মাণ করেন বাংলার সুলতান নাসির উদ্দিন নুসরত শাহ। কারুকার্যখচিত এই মসজিদ প্রাচীন মুসলিম স্থাপত্যকলার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। রাজশাহীর বাঘা উপজেলা সদরে ১৫২৩-২৪ খ্রিষ্টাব্দে (হিজরি-৯৩০) নির্মিত মসজিদটি আজও তার ঐতিহ্য ও সৌন্দর্যে গর্বিতভাবে দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৪ সালে মসজিদটির ৫০০ বছর পূর্ণ হলে, এর ছবি বাংলাদেশের ৫০ টাকার পুরোনো নোট এবং ১০ টাকার স্মারক ডাকটিকিটে প্রদর্শিত হয়।
বাঘার শাহী মসজিদ: ঐতিহ্যের অনন্য নিদর্শন
রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় অবস্থিত ঐতিহাসিক শাহী মসজিদ দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। অনন্য স্থাপত্যশৈলীর জন্য সারা বছরই এখানে দর্শনার্থীদের সমাগম ঘটে। রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই মসজিদকে কেন্দ্র করে এলাকাবাসী দীর্ঘদিন ধরে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটনকেন্দ্র ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে স্বাধীনতার পর ৫৪ বছর পার হলেও এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি।
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের পুত্র সুলতান নাসিরউদ্দিন নুসরত শাহ বিপুল অর্থ ব্যয় করে পদ্মা নদীর তীরবর্তী বাঘায় এই শাহী মসজিদ নির্মাণ করেন। হোসেন শাহী শাসনামল বাংলার মুসলিম শাসনের স্বর্ণযুগ হিসেবে পরিচিত। এই সময় বাংলায় সাংস্কৃতিক ও স্থাপত্যশিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে। বাঘার শাহী মসজিদসহ চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ ও অন্যান্য স্থাপনা আজও সেই গৌরবময় অধ্যায়ের সাক্ষ্য বহন করে।
২৫৬ বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত বাঘার শাহী মসজিদের মূল ভবন সমতল ভূমি থেকে ৮-১০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। এর উত্তর পাশের প্রবেশদ্বারের কিছু অংশ ধ্বংস হয়ে গেলেও মূল কাঠামো এখনো স্থাপত্যশৈলীর সৌন্দর্য বহন করে চলেছে। মসজিদটিতে রয়েছে ১০টি গম্বুজ, ৬টি স্তম্ভ এবং ৪টি কারুকার্যখচিত মেহরাব। এর দৈর্ঘ্য ৭৫ ফুট, প্রস্থ ৪২ ফুট এবং উচ্চতা ২৪ ফুট ৬ ইঞ্চি। ৮ ফুট প্রশস্ত দেয়াল ও বিশেষ নির্মাণশৈলী মসজিদটিকে সুদৃঢ় করে তুলেছে।
মসজিদের ভেতরে ও বাইরের দেয়ালে টেরাকোটার নকশা চোখে পড়ে। প্রবেশদ্বারের ওপরে একটি ফার্সি ভাষায় লেখা শিলালিপিও সংরক্ষিত রয়েছে। মসজিদের চারপাশে রয়েছে সুরক্ষিত প্রাচীর ও দুটি প্রবেশদ্বার। পাশেই রয়েছে একটি বিশাল দিঘি, যা দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ। এছাড়া মসজিদের নিকটে রয়েছে একটি মাজার শরিফ ও নারী মসজিদ, যা এলাকাটিকে আরও ঐতিহাসিক গুরুত্ব প্রদান করে।
স্থানীয়রা আশাবাদী, ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও পর্যটকদের আগ্রহের কথা বিবেচনা করে বাঘার শাহী মসজিদকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা হবে, যা দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাঘার শাহী মসজিদের দিঘি ও ঐতিহ্যবাহী মেলা
বঙ্গের স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের পুত্র নাসির উদ্দিন নুসরত শাহ জনসাধারণের কল্যাণে বাঘার শাহী মসজিদের সামনে ৫২ বিঘা আয়তনের একটি বৃহৎ দিঘি খনন করেন। দিঘিটির চারপাশে সারিবদ্ধভাবে লাগানো নারকেল গাছ পরিবেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। শীতের মৌসুমে এখানে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখির আগমন ঘটে, যা পুরো এলাকা মুখরিত করে তোলে। দিঘিটির সৌন্দর্য ও ব্যবহারের সুবিধার্থে বর্তমানে চারটি বাঁধানো পাড় নির্মাণ করা হয়েছে।
মসজিদের পাশেই রয়েছে জহর খাকী পিরের মাজার, যা স্থানীয়দের কাছে ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া, প্রতি বছর ঈদুল ফিতরের দিন থেকে শুরু করে ১৫ দিনব্যাপী এক ঐতিহ্যবাহী মেলা অনুষ্ঠিত হয়, যা ৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসছে।
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, প্রায় পাঁচশত বছর আগে সুদূর বাগদাদ থেকে পাঁচজন সঙ্গীসহ ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাঘায় আসেন সুফিসাধক হজরত শাহ মোয়াজ্জেম ওরফে শাহদৌলা (রহ.)। তার আগমনের ফলে বহু মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং এ অঞ্চলে ইসলামী সংস্কৃতির প্রসার ঘটে।
ওয়াকফ এস্টেটের সাবেক মোতওয়ালি খন্দকার মুনসুরুল ইসলাম রইশ জানান, একসময় মসজিদের প্রবেশপথের ওপরে থাকা ফারসি ভাষায় খোদাই করা শিলালিপিটি চুরি হয়ে যায়। তবে পরবর্তীতে এটি মসজিদের ভেতরে পুনরায় সংরক্ষিত করা হয়।
বাঘা শাহী মসজিদ কমপ্লেক্সের সহকারী কাস্টোডিয়ান দবির হোসেন জানান, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মসজিদকে ঘিরে থাকা বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন তালিকাভুক্ত করেছে। এছাড়া, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ঐতিহাসিক এ স্থাপনার যথাযথ সংরক্ষণের মাধ্যমে বাঘাকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।