দেশীবার্তা নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

বেসরকারি জ্বালানি আমদানিতে আপত্তি নেই, প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে পূর্ণ আস্থা: এয়াকুব

সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও বর্তমানে দেশে তেল আমদানি করছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ অয়েল অ্যান্ড গ্যাস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের মহাসচিব ও যমুনা অয়েল কোম্পানি লেবার ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ এয়াকুব।

তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেল আমদানি করে তা পরিশোধন করছে। পরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মাধ্যমে সেই তেল বাজারজাত করা হচ্ছে। ফলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তেল আমদানির কার্যক্রম ইতোমধ্যে চলমান রয়েছে।

জ্বালানি তেলের সংকট নিরসনে সরকার যদি বেসরকারিভাবে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেয়, তাতেও তাদের আপত্তি নেই বলে জানিয়েছেন এই শ্রমিক নেতা।

মুহাম্মদ এয়াকুব বলেন, “তারেক রহমানের সরকার জনগণের সরকার। জ্বালানি তেলের সংকট নিরসনে তিনি যে সিদ্ধান্ত নেবেন, আমরা তার সঙ্গে একমত।”

তিনি আরও বলেন, “দেশের উন্নয়ন ও জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারকে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের সংকট নিরসনে দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ করে সরকার যে ধরনের সিদ্ধান্ত নেবে, আমরা তার সঙ্গে একমত পোষণ করি।”

প্রধানমন্ত্রী এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না, যাতে দেশের মানুষ বা জ্বালানি খাতের শ্রমিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “তারেক রহমানের সরকার শ্রমিকবান্ধব সরকার। আমরা মনে করি, এমন কোনো সিদ্ধান্ত তিনি চাপিয়ে দেবেন না, যাতে এই খাত বা দেশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”

জ্বালানি খাত অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ

এ সময় সরকারের ভেতরে থাকা একটি “কুচক্রী মহল” শ্রমিকদের অধিকার খর্ব করে জ্বালানি খাতকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন মুহাম্মদ এয়াকুব।

তার অভিযোগ, অযাচিত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে জ্বালানি খাতের শ্রমিকদের বিদ্যমান ২২টি সুনির্দিষ্ট সুযোগ-সুবিধা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা যুগোপযোগী করার ক্ষেত্রে গড়িমসি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে শ্রম আইনকে শ্রমিকবান্ধবের পরিবর্তে শ্রমিকবিরোধী করারও চেষ্টা চলছে।

তিনি বলেন, “সরকার শ্রমিকদের ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার কথা বলছে। এ জন্য নানা উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু জ্বালানি খাতে এর উল্টোটা ঘটছে। বিপিসির আওতাধীন পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, এসএওসিএল, এলপিজিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পরিবর্তে কমানোর পাঁয়তারা চলছে।”

শ্রমিক নেতাদের বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জ্বালানি খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের পথ রুদ্ধ করার অপচেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

“শ্রমিক-কর্মচারীরা জ্বালানি খাতে শান্তি চায়। তারা শুধু তাদের ন্যায্য অধিকার, হয়রানিমুক্ত ও অযাচিত হস্তক্ষেপমুক্ত কর্মপরিবেশ চায়,” বলেন এয়াকুব।

দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নিয়ে ক্ষোভ

সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিপিসির তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সাধারণত দুই বছর পরপর দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে যুগোপযোগী করা হয়। তবে সর্বশেষ চুক্তির মেয়াদ প্রায় ১৯ মাস পার হতে চললেও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর অবহেলা ও গড়িমসির কারণে নতুন চুক্তি সম্পন্ন করা যাচ্ছে না।

এ ছাড়া জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে গত ১৭ জুন বিপিসির আওতাধীন কোম্পানিগুলোর ‘প্রান্তিক সুবিধা নীতিমালা-২০২৬’-এর খসড়া প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এর মাধ্যমে শ্রমিক-কর্মচারীদের বিদ্যমান ২২টি সুযোগ-সুবিধা কাটছাঁটের চেষ্টা করা হচ্ছে।

একইভাবে বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬-এর ২(৬২) ধারায় সংজ্ঞায়িত ‘শিল্প বিরোধ ও শিল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’ সংক্রান্ত ২০৯, ২১০ ও ২১১ ধারা রহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়। তাদের দাবি, এতে শ্রমিক-কর্মচারীদের অধিকার আদায়ে প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করা সিবিএ নেতাদের ক্ষমতা খর্ব হবে।

শ্রমিক সংগঠন মনিটরিং নিয়েও উদ্বেগ

এ ছাড়া গত ২৬ জুলাই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে জারি করা একটি অফিস আদেশে বিপিসির পরিচালক (অপারেশন)কে আহ্বায়ক করে আট সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তেল বিপণন কোম্পানিগুলোতে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের কার্যক্রম মনিটরিং এবং জবাবদিহির বিষয়ে সুপারিশ দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ওই কমিটিকে।

এ ধরনের উদ্যোগ স্পর্শকাতর জ্বালানি খাতের শ্রমিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।

এদিকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কোম্পানি-সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের অধীনে ‘নো ওয়ার্ক, নো পে’ ভিত্তিতে অল্প বেতনে কাজ করা শ্রমিকদের লোকবল নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার না দেওয়ার অভিযোগও তুলে ধরা হয়।

অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির সুযোগ দেওয়া হবে না

জ্বালানি খাতে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন মুহাম্মদ এয়াকুব।

তিনি বলেন, “আমরা জানিয়ে দিতে চাই, জ্বালানি খাতে কাউকে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির সুযোগ দেওয়া হবে না। শ্রমিক-কর্মচারীরা শুধু তাদের ন্যায্য অধিকার চায়। তারা হয়রানি বন্ধ এবং অযাচিত হস্তক্ষেপমুক্ত পরিবেশ চায়।”

যমুনা অয়েল কোম্পানি লেবার ইউনিয়নের সভাপতি আবুল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় পদ্মা অয়েল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি জসিম উদ্দিন, এলপিজি শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মনির হোসেন, বিপিসি শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম, পদ্মা অয়েল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের দপ্তর সম্পাদক সেলিম কবির চৌধুরী, যমুনা অয়েল লেবার ইউনিয়নের সহসাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মোহাম্মদ মন্নানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ অয়েল অ্যান্ড গ্যাস ওয়ার্কার্স ফেডারেশন জ্বালানি তেল ও গ্যাস খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের একটি শীর্ষ সংগঠন। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড, মেঘনা পেট্রোলিয়াম করপোরেশন লিমিটেড, যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড, ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড, স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেড ও এলপি গ্যাস লিমিটেডের সিবিএ সংগঠনগুলো নিয়ে এই ফেডারেশন গঠিত।