
মিলনায়তনের প্রবেশমুখের খোলা প্রাঙ্গণে দুই পাশে স্টিলের ফ্রেমে সাজানো ছিল বেশ কিছু স্থিরচিত্র। ছবিগুলোতে ফুটে উঠেছে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের নানা দৃশ্য। কোথাও আগুনের তীব্র শিখায় জ্বলছে ভবন, কোথাও পুড়ে যাওয়া সংবাদকক্ষ, আবার কোথাও ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা কাগজপত্র। এগুলো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রদর্শনীর অংশ নয়; বরং ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার নীরব সাক্ষ্য বহন করছে। সেই বিভীষিকাময় রাত থেকে প্রাণে বেঁচে ফিরেছিলেন পত্রিকাটির ৩০ জন সংবাদকর্মী।
দ্য ডেইলি স্টারের ৩৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রোববার বিকেলে বরিশালের বান্দ রোডে কীর্তনখোলা নদীর তীরে অবস্থিত শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে এক সুধী সমাবেশের আয়োজন করা হয়। মিলনায়তনে প্রবেশের সময় আমন্ত্রিত অতিথিরা হামলার ভয়াবহতার চিত্রগুলো দেখে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে যান। তবে তাঁদের উপলব্ধি ছিল স্পষ্ট—উচ্ছৃঙ্খল জনতা একটি ভবন ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু ‘নির্ভীক ও নিরপেক্ষ’ সাংবাদিকতার আদর্শকে কখনো নিঃশেষ করতে পারে না।
বিকেল সাড়ে চারটায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান এবং জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হলে পুরো মিলনায়তনে নেমে আসে গভীর নীরবতা।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, বরিশাল কৃষি ও পর্যটনের দিক থেকে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় অঞ্চল হলেও তাঁদের পত্রিকায় সেই সম্ভাবনাগুলো পর্যাপ্তভাবে তুলে ধরা সম্ভব হয়নি। এ জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতে বিষয়গুলো আরও গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশের আশ্বাস দেন।
স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে মাহফুজ আনাম বলেন, এটি কেবল সাংবাদিকদের জন্য নয়; সমাজ, রাষ্ট্র এবং গণতন্ত্রের স্বার্থেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, যে সমাজ স্বাধীন সাংবাদিকতাকে সমর্থন করে, সেই সমাজেই জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক চর্চা শক্তিশালী হয়। তিনি স্বাধীন সাংবাদিকতাকে একজন চিকিৎসকের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, যেমন চিকিৎসক রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসার পথ দেখান, তেমনি স্বাধীন গণমাধ্যম সমাজ ও রাষ্ট্রের ত্রুটি-বিচ্যুতি চিহ্নিত করে সামনে আনে। তাঁর ভাষ্য, স্বাধীন সাংবাদিকতা ছাড়া গণতন্ত্রের বিকাশ সম্ভব নয় এবং সমাজও সুস্থভাবে এগোতে পারে না।
রাজনীতিবিদদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, সত্য কথা তুলে ধরার ক্ষেত্রে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার বিকল্প নেই। দলীয় নেতা-কর্মী, আমলাতন্ত্র কিংবা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অনেক সময় প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করতে সাহস পায় না। একমাত্র স্বাধীন ও মানসম্মত সাংবাদিকতাই সরকার ও রাজনীতিবিদদের সামনে বাস্তবতা তুলে ধরতে পারে। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক সরকার যদি স্বাধীন সাংবাদিকতার গুরুত্ব উপলব্ধি না করে, তবে শেষ পর্যন্ত জনরোষের মুখে পড়ে। ইতিহাসে এর বহু উদাহরণ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মাহফুজ আনাম আরও বলেন, ৩৫ বছরের পথচলা এবং ২০২৫ সালের ধ্বংসাত্মক হামলার পর পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা দ্য ডেইলি স্টারের স্বাধীন সাংবাদিকতার অবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে। তাঁর দাবি, পত্রিকাটি কখনো কোনো সরকারের পক্ষ নেয়নি; বরং সব সময় সত্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং প্রতিটি সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনার চেষ্টা করেছে, যা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

অনুষ্ঠানে বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও বরিশাল জেলা পরিষদের প্রশাসক আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, তাঁদের দল সব সময় গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেয়। তিনি উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না। তাঁর মতে, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতায় ডেইলি স্টারের ভূমিকা প্রশংসনীয় এবং এই ধারা ভবিষ্যতেও বজায় থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বরিশাল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি এবায়দুল হক চান বলেন, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে বরিশাল এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ডেইলি স্টার এসব বিষয় জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। বিশেষ করে ভোলার গ্যাস বরিশালে সরবরাহ, ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীতকরণ, পায়রা বন্দরের কার্যক্রম আরও গতিশীল করা এবং কুয়াকাটাকে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক পর্যটনকেন্দ্রে রূপান্তরের বিষয়গুলো সরকারের কাছে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে সংঘটিত হামলার নিন্দা জানিয়ে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন ডেইলি স্টারের বরিশাল প্রতিনিধি সুশান্ত ঘোষ। এছাড়া বক্তব্য দেন বরিশালের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. ওবায়েদুল্লাহ, বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আলম ফরিদ, নগর জামায়াতের নায়েবে আমির মাহমুদ হোসাইন দুলাল, ইসলামী আন্দোলনের জেলা আমির সিরাজুল ইসলাম, বাম গণতান্ত্রিক ঐক্য ফ্রন্টের সমন্বয়ক শহিদুল ইসলাম (মিলন), বাসদের জেলা সদস্য সুজন আহমেদ, এবি পার্টির মহানগর সদস্যসচিব জি এম রাব্বি, গণসংহতি আন্দোলনের জেলা শাখার নির্বাহী সমন্বয়ক আরিফুর রহমান (মিরাজ), গণ–অধিকার পরিষদের বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম (রাসেল), সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) জেলা সভাপতি টুলু রানী কর্মকার, বরিশাল প্রেসক্লাবের সভাপতি আমিনুল ইসলাম (খসরু), বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক খালিদ সাইফুল্লাহ এবং শিশু সংগঠক পংকজ রায় চৌধুরীসহ আরও অনেকে।