
‘সুড়ঙ্গ’, ‘পরাণ’, ‘তুফান’—টানা তিনটি সিনেমা দিয়েই বাংলা চলচ্চিত্রে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন রায়হান রাফী। ‘তুফান’ মুক্তির পর তো রীতিমতো ঝড় উঠেছিল সিনেমাপ্রেমীদের মাঝে। মধুমিতা হলে টিকিটের জন্য হুল্লোড়, ভাঙচুরের মতো ঘটনা বহুদিন দেখা যায়নি। বড় পর্দার পাশাপাশি ছোট পর্দা ও ওটিটিতেও দেখিয়ে চলেছেন নিজের মুনশিয়ানা।
তবে এই সাফল্যের যাত্রা সহজ ছিল না। এটি ছিল পরিশ্রম, স্বপ্ন আর আত্মত্যাগের গল্প।
শুরুটা মায়ের ত্যাগ দিয়ে
রাফীর সিনেমা নির্মাণের স্বপ্ন শুরু হয়েছিল যখন তিনি নবম শ্রেণিতে পড়তেন। তখনই প্রথম শর্টফিল্ম বানানোর ইচ্ছা জাগে, কিন্তু বাজেট ছিল না। টাকার অভাবে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তখনই মা পাশে দাঁড়ান। ছেলেকে নিয়ে বাজারে গিয়ে নিজের সোনার চেইন বিক্রি করে তুলে দেন ১২ হাজার টাকা। সেই টাকায় রাফী বানান প্রথম শর্টফিল্ম ‘আজব বাক্স’।
আজকের সফল নির্মাতা
সেই ছোট স্বপ্ন থেকে আজকের রায়হান রাফী হয়ে ওঠা সহজ ছিল না। একের পর এক সিনেমায় নিজেকে প্রমাণ করেছেন। দর্শক জানেন, তাঁর সিনেমায় বৈচিত্র্য থাকবে, থাকবে নতুনত্ব। তাঁর নির্মাণের জন্য দর্শক এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন।
আজ ৩ মার্চ রায়হান রাফীর জন্মদিন। মায়ের আত্মত্যাগ আর নিজের কঠোর পরিশ্রমে তৈরি হওয়া এই নির্মাতা যেন আরও নতুন গল্প দিয়ে দর্শককে মুগ্ধ করতে পারেন, সেই প্রত্যাশাই রইল।
‘পরাণ’ দর্শকের মন জয় করল কেন?
‘পরাণ’–এর গল্প খুব চেনা, খুব পরিচিত। বখাটে ছেলেটি ভালোবাসে এক মেয়েকে, কিন্তু মেয়েটি তাকে ভালো না বেসেও সম্পর্ক ধরে রাখে, সুবিধা নেয়, পরে আরেকজনকে ভালোবাসে। এমন ত্রিকোণ প্রেমের গল্প আমাদের চারপাশেই শোনা যায়। কিন্তু পরিচিত একটি গল্পকেও যদি নির্মাতা বুদ্ধিদীপ্তভাবে পর্দায় উপস্থাপন করতে পারেন, তাহলে সেটাই দর্শকের মনে দাগ কাটে—এটাই ‘পরাণ’-এর সাফল্যের মূল কারণ।
রায়হান রাফী ঠিক সেটাই করেছেন। বাস্তব জীবনের টানাপোড়েন, আবেগের টানাপোড়েন, সম্পর্কের জটিলতা—এসব কৌশলী নির্মাণশৈলীতে উপস্থাপন করেছেন তিনি। ফলে সিনেমাটি দর্শকদের মনে জায়গা করে নিয়েছে। বাস্তব জীবনের গল্পের সঙ্গে যখন দর্শক নিজের অনুভূতিগুলো মেলাতে পারেন, তখনই সিনেমা সফল হয়। ‘পরাণ’-এর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

বাস্তবতার রঙে গল্প বলা, এটাই রায়হান রাফীর এক্স ফ্যাক্টর
রায়হান রাফীর নির্মাণের দিকে তাকালে একটা বিষয় স্পষ্ট—তিনি গল্প বলেন বাস্তবতার রঙে। তাঁর ওয়েব সিনেমা ‘মায়া’ তারই প্রমাণ। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বিঞ্জে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমায় তিনি দেখিয়েছেন এক নারীর জীবনসংগ্রামের গল্প। নেশাগ্রস্ত স্বামীর সংসারে একজন নারী কীভাবে লড়াই করেন, কত বাঁকা চাহনি সহ্য করতে হয়, কী অসহায়ত্ব তাকে ঘিরে ধরে—এসব দৃশ্য তিনি নির্মাণের দক্ষতায় জীবন্ত করে তুলেছেন।
এই যে বাস্তব কাহিনিকে সিনেমার ফ্রেমে তুলে ধরা, এটিই রাফীর সবচেয়ে বড় শক্তি। তাঁর ‘পোড়ামন টু’, ‘দহন’, ‘টান’, ‘সাত নম্বর ফ্লোর’, ‘পরাণ’, ‘সুড়ঙ্গ’, ‘তুফান’—সবগুলো গল্পেই বৈচিত্র্য আছে। কিন্তু এই বৈচিত্র্যের মধ্যেও একটা মিল আছে—দর্শক নিজেদের জীবনের কোনো না কোনো অভিজ্ঞতা বা আশেপাশে দেখা ঘটনা এর সঙ্গে মেলাতে পারেন।
এটাই রাফীর নির্মাণের এক্স ফ্যাক্টর। তাঁর গল্প শুধু বিনোদন দেয় না, বাস্তবতাকে পর্দায় তুলে এনে দর্শকের মনে গভীর দাগ কাটে। আর এ কারণেই তাঁর সিনেমার জন্য দর্শকের অপেক্ষা থাকে, আলোচনা হয়, সিনেমাহলে হুল্লোড় পড়ে যায়।

রিত্র রূপায়ণের দক্ষতাই কি রায়হান রাফীর সিনেমার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়িয়েছে?
রায়হান রাফীর সিনেমার অন্যতম আকর্ষণ—চরিত্রের নিখুঁত রূপায়ণ। তিনি শুধু গল্প বলেই থেমে যান না, বরং প্রতিটি চরিত্রকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যেন তারা বাস্তবেরই কেউ। এই গভীরতাই দর্শকদের সিনেমার সঙ্গে সংযুক্ত করে রাখে।
‘পরাণ’-এর রোমান: নিখুঁত এক বখাটে চরিত্র
‘পরাণ’-এ রোমান চরিত্রটি বখাটে হিসেবেই উপস্থাপিত হয়েছে, কিন্তু সেটা কেবল একরৈখিকভাবে নয়। রাফীর নির্মাণে রোমান হয়ে ওঠে জটিল, আবেগপ্রবণ, রাগী—একটি পরিপূর্ণ চরিত্র। একইভাবে শিফাত, স্বপন, তোতা মিয়া, অনন্যা—সব চরিত্রই স্বতন্ত্র, আলাদা।
‘সুড়ঙ্গ’-এর মাসুদ: নিশোর এক নতুন রূপ
‘সুড়ঙ্গ’ সিনেমায় মাসুদ চরিত্রে আফরান নিশোকে একেবারে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন রাফী। শুধু নিশো নয়, ময়না ও জহির চরিত্রও ছিল বাস্তবধর্মী, যা দর্শকদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
‘তুফান’-এর শাকিব খান: দ্বৈত চরিত্রের অনন্য রূপায়ণ
‘তুফান’-এ শাকিব খানকে দ্বৈত চরিত্রে উপস্থাপন করেছেন রাফী—তুফান ও শান্ত। এই দুই চরিত্র দেখতে একই হলেও তাদের ব্যক্তিত্ব, কথোপকথন, লুক ও কস্টিউম—সবকিছুতে পার্থক্য এনেছেন তিনি। পুলিশ অফিসারের চরিত্রও রাফীর হাতে নতুন মাত্রা পেয়েছে। তিনি গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে পুলিশ চরিত্রকে আরও বাস্তবসম্মত, আধুনিকভাবে উপস্থাপন করেছেন।
চরিত্র নির্মাণেই রাফীর মুন্সিয়ানা
রাফীর সিনেমাগুলো দেখলে বোঝা যায়, তিনি চরিত্র নির্মাণে বাড়তি যত্ন নেন। চরিত্রগুলোর আবেগ, ভাষা, আচরণ, পোশাক—সব কিছুতেই থাকে বাস্তবের ছোঁয়া। আর এ কারণেই তাঁর সিনেমার চরিত্রগুলো দর্শকের মনে দাগ কাটে, আলোচনায় আসে এবং সিনেমার প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়।
গান, বাস্তব কাহিনি আর নতুন ভাবনা—এভাবেই দর্শক মাতাচ্ছেন রায়হান রাফী
রায়হান রাফীর সিনেমার প্রতি দর্শকের আগ্রহ বাড়ানোর পেছনে তাঁর নির্মাণশৈলী যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গানও বড় ভূমিকা রাখে। ‘তুফান’ সিনেমার ‘দুষ্টু কোকিল’ ও ‘লাগে উরাধুরা’ গান দুটি যে পরিমাণ আলোড়ন তুলেছে, তা বাংলাদেশের সিনেমায় বিরল ঘটনা।
গানের ক্ষেত্রে রাফীর যত্নশীলতা
‘লাগে উরাধুরা’ গানের সাফল্য প্রসঙ্গে রাফী নিজেই বলেছেন, ‘এমন একটা গান চাইছিলাম, যে গান দেশের মানুষকে মাতোয়ারা করবে। গানের সঙ্গে নাচবেন সব বয়সী দর্শক। এজন্য একের পর এক অপেক্ষা করতে হয়েছে। চার মাস লেগেছে গানটির কথা, সুর, সংগীত ঠিক করতে।’—এ থেকেই বোঝা যায়, তিনি গানের ক্ষেত্রেও কতটা সচেতন।
সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রেরণা—রাফীর সিগনেচার স্টাইল
রাফী বরাবরই বাস্তব ঘটনার ছায়া অবলম্বনে সিনেমা নির্মাণ করতে পছন্দ করেন। ‘জানোয়ার’, ‘ফ্রাইডে’, ‘টান’, ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’—এসব সিনেমা সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নির্মাণ করেছেন। তাঁর সিনেমাগুলো শুধু বিনোদন নয়, বরং সমসাময়িক সমাজের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে।
‘ব্ল্যাক মানি’—ডার্ক কমেডির নতুন স্বাদ
রাফীর প্রথম ওয়েব সিরিজ ‘ব্ল্যাক মানি’, যেখানে কালোটাকা ও দুর্নীতির গল্পকে ডার্ক কমেডির মোড়কে উপস্থাপন করা হয়েছে। কীভাবে এই গল্প পেলেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে রাফী বলেন, ‘আর দশটা গল্প যেভাবে আমার মাথায় আসে, এটিও সেভাবেই এসেছে। গল্পটা পাওয়ার পর থেকেই পরিকল্পনা করছিলাম, এটি সিরিজ বানাব।’
হাস্যরসের মধ্যেও গভীরতা
‘ব্ল্যাক মানি’ মুক্তির পর দর্শক এটিকে দুঃখ-যন্ত্রণার মধ্যে হালকা গল্প হিসেবে উপভোগ করেছেন, আবার সূক্ষ্ম চিন্তার জায়গাও পেয়েছেন। ডার্ক কমেডি ঘরানায় কাজ করার মাধ্যমে রাফী দেখিয়েছেন, তিনি শুধু সাধারণ প্রেমের গল্পেই সীমাবদ্ধ নন, বরং ভিন্ন ভিন্ন ঘরানার গল্প নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে ভালোবাসেন।
সাফল্যের মূল রহস্য—নতুনত্বের প্রতি একাগ্রতা
রাফীর কাজের ধরন দেখলে বোঝা যায়, তিনি প্রতিটি ক্ষেত্রে নতুন কিছু উপস্থাপন করতে চান—চরিত্র নির্মাণ, গান, সত্য ঘটনা অবলম্বনে গল্প বলা কিংবা নতুন ঘরানায় কাজ করা—সবকিছুতেই তাঁর নিজস্ব একটা ছাপ থাকে। আর এ কারণেই তাঁর সিনেমা ও ওয়েব সিরিজগুলো এত বেশি জনপ্রিয় হয়।

রায়হান রাফী এখন ‘আমলনামা’ নিয়ে আসছেন—সত্য ঘটনার ছায়ায় আরও এক অনন্য সৃষ্টি
রায়হান রাফী এবার ‘আমলনামা’ সিনেমা নিয়ে আসছেন, যা সত্য ঘটনার ছায়ায় নির্মিত একটি চরকি অরিজিনাল ফিল্ম। ইতিমধ্যে সিনেমাটির ফোরটেস্ট ও থিমেটিক পোস্টার প্রকাশিত হয়েছে, এবং তা দর্শকদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। পোস্টার ও ফোরটেস্টের ক্যাপশনে বিচার-অবিচারের মতো শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে, যা সিনেমার গল্পের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িত। এই শব্দগুলো সিনেমার আসল সারবত্তাকে ফুটিয়ে তোলে।
‘আমলনামা’-এর গল্প নিয়ে দর্শক এখন উত্তেজিত, এবং তারা জানতে চাইছেন, কবে মুক্তি পাবে এই সিনেমা। চরকির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রেদওয়ান রনি জানিয়েছেন, দর্শকদের খুব শিগগিরই ‘আমলনামা’ দেখতে পাবেন। তিনি আরো বলেছেন, “পোস্টার ও ফোরটেস্টের ক্যাপশনে বিচার-অবিচারের কথা বলা হয়েছে, গল্পের সঙ্গে এই শব্দগুলো খুবই প্রাসঙ্গিক। ‘আমলনামা’য় এমন এক ঘটনা নিয়ে আসা হয়েছে, যা সিনেমার গল্পে নতুন। যে বিষয় নিয়ে কথাই বলা যেত না, সেটা নিয়েই আমরা এবার সিনেমা বানিয়েছি। আশা করছি, দর্শকেরা নতুন কিছু অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবেন। এবং ছবিটি দেখতে বসে দর্শক বারবার কান্না করবেন।”
নতুন অনুভূতি, নতুন অভিজ্ঞতা—রাফীর দৃঢ় ঘোষণা
এখানে যে দৃঢ় উচ্চারণ রয়েছে, তা রায়হান রাফীর নিজস্ব শৈলীর পরিচায়ক। তাঁর কাজের মধ্যে যেমন থাকে নতুনত্ব, তেমনি থাকে গভীর অনুভূতি। ‘আমলনামা’ সম্পর্কিত রাফীর কথা এই নতুন সিনেমার জন্য দর্শকদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ তৈরি করেছে।
এরই মধ্যে নিশ্চিত করা গেছে, যে বিষয়টি সিনেমায় তুলে ধরা হচ্ছে, তা এমন এক ঘটনা যা আগে প্রকাশ্যে বলা যেত না। তাই দর্শকরা যখন ছবিটি দেখবেন, তখন তারা সত্যিকার অর্থে এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবেন, যেটি তাদের ভাবাবে এবং আবেগে ভাসাবে।